দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য থামাতে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বিশেষ করে আসন্ন বোরো মৌসুমে কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে ভর্তুকি মূল্যের তেল যেন কোনোভাবেই সীমান্তের ওপারে না যায়, সে বিষয়ে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২৮ মার্চ) বিকেলে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে আয়োজিত সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সংসদ সদস্যদের জনস্বার্থে নিবেদিত হয়ে কাজ করার জন্য বিশেষ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
জ্বালানি তেলের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বাবাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিশ্বের বহু দেশে তেলের দাম কয়েক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের একটি বড় সাফল্য। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার আগে থেকেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল বলেই আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও দেশের সাধারণ মানুষের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেওয়া হয়নি। এটি বর্তমান প্রশাসনের দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রতিফলন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিশেষভাবে কৃষিখাতের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বোরো মৌসুম আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকরা যাতে কোনো ধরনের সংকট ছাড়াই আবাদ চালিয়ে যেতে পারেন, সেজন্য সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি (সরকারি আর্থিক সহায়তা) দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করছে। তবে এই জনবান্ধব উদ্যোগের সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু চক্র যাতে তেল চোরাচালানের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ফায়দা লুটতে না পারে, সে বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। চোরাচালানের বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে এবং এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
সংসদীয় দলের এই বৈঠকে গত এক মাসে সরকারের অর্জন ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়েও বিস্তারিত আলাপ হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র এক মাসের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পরিচালিত সরকার জনকল্যাণে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। সামনের দিনগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নই হবে সরকারের মূল লক্ষ্য। এছাড়া রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব এবং সংসদে কে কোন বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন, তা নিয়েও একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।
বৈঠকের শুরুতেই একটি শোকাবহ পরিবেশের অবতারণা হয়। জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের (বীর বিক্রম) সহধর্মিণী দিলারা হাফিজের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীসহ উপস্থিত সকল সংসদ সদস্য। মরহুমার রুহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, সরকার কেবল আইন প্রণয়ন নয়, বরং সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে চায়। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের বাজার ও জ্বালানি খাতের সিন্ডিকেট (অসাধু ব্যবসায়ী চক্র) ভেঙে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর। প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশ রয়েছে যে, জনগণের সম্পদ লুটপাটকারী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং চোরাচালান বন্ধের এই ঘোষণা মূলত সরকারের সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে বোরো মৌসুমে তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে তার প্রভাব সরাসরি খাদ্যদ্রব্যের ওপর পড়ার সম্ভাবনা থাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থান যদি মাঠ পর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে সাধারণ মানুষ এর সুফল পাবে। তবে কেবল হুঁশিয়ারি নয়, সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারি এবং অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে আমাদেরও উচিত এমন কোনো অপতৎপরতা চোখে পড়লে প্রশাসনকে সহায়তা করা।