বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা বিতর্কিত বাণিজ্য তদন্তের শুনানি আগামী মে মাসে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। অতি উৎপাদন ও জোরপূর্বক শ্রমের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের (ইউএসটিআর) ভার্চুয়ালি এই শুনানি গ্রহণ করার কথা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিমণ্ডলে নতুন এক অস্থিরতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইন অনুযায়ী শুরু হওয়া এই তদন্তে বাংলাদেশের নাম আসায় জনমনে নানা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও শুরুর দিকে ২৮ বা ২৯ এপ্রিল এই শুনানি হওয়ার কথা শোনা গিয়েছিল, তবে বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শুনানির সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। মে মাসের শুরুর দিকে যেকোনো দিন এই ভার্চুয়াল শুনানি (ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরাসরি আলোচনা) শুরু হতে পারে।
বাণিজ্য সচিব আব্দুর রহিম এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট তারিখ না মিললেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে কোনো অতিরিক্ত সক্ষমতা বা বৈষম্যমূলক নীতি নেই—এমন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলছে জোরেশোরে। এছাড়া বাংলাদেশে কোনো ধরনের জোরপূর্বক শ্রম বা শিশুশ্রমের অস্তিত্ব নেই বলেও দাবি করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শুনানিতে উপস্থাপনের জন্য ইতিমধ্যে একটি শক্তিশালী অবস্থানপত্র (পজিশন পেপার) তৈরি করা হয়েছে।
গত মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর ইউএসটিআর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা মোতাবেক এই তদন্ত শুরু করে। ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য হলো খতিয়ে দেখা যে, এসব দেশের বাণিজ্য নীতি মার্কিন উৎপাদন খাতের জন্য ক্ষতিকর কি না। বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও সিমেন্ট শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য কোনো ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে দেশটি। বাংলাদেশ ছাড়াও এই তদন্তের তালিকায় চীন, ভারত, জাপান এবং ভিয়েতনামের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো রয়েছে।
বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে তাদের পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান বাড়াতে কঠোর নীতি গ্রহণ করছে। বাংলাদেশের জন্য এটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ, কারণ আমাদের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৮ শতাংশই আসে মার্কিন বাজার থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটিতে প্রায় ৮৬৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।
উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই বাণিজ্য যুদ্ধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। গত বছর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক (কাউন্টারভেইলিং ডিউটি) আরোপ করেছিলেন। যদিও সুপ্রিম কোর্ট একে অবৈধ ঘোষণা করেছিল, কিন্তু প্রেসিডেন্টের বিশেষ ক্ষমতাবলে নতুন করে ১৫ শতাংশ শুল্ক পুনরায় আরোপ করা হয়, যা গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর রয়েছে। এই নতুন তদন্ত ও শুল্কনীতির লড়াইয়ে বাংলাদেশ এখন মে মাসের শুনানির দিকে তাকিয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং ভূ-রাজনীতির একটি অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার রক্ষায় এই শুনানিতে সঠিক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি। এটি কেবল একটি আইনি লড়াই নয়, বরং বাংলাদেশের শ্রম মান ও উৎপাদন সক্ষমতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিরও প্রশ্ন। সরকার ও পোশাক রপ্তানিকারকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা এখন সময়ের দাবি।