তীব্র আর্থিক সংকটে জর্জরিত পাকিস্তানকে স্বস্তি দিতে আবারও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সৌদি আরব। সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে রিয়াদ দেশটিকে অতিরিক্ত ৩০০ কোটি ডলার (৩ বিলিয়ন ডলার) দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুতের ওপর সৃষ্ট চাপ কমাতে এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখতে এই বিশাল অঙ্কের আমানত রাখতে সম্মত হয়েছে সৌদি আরব। বর্তমানে পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব ওয়াশিংটনে অবস্থান করছেন। সেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, সৌদি আরবের আগের ৫০০ কোটি ডলারের আমানতের মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি এই নতুন সহায়তা আসছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পাকিস্তানের জন্য চলতি মাসটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কারণ, এ মাসেই দেশটিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৩৫০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে গেলে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে বড় ধরনের টান পড়ার আশঙ্কা ছিল। মার্চের শেষ দিকে দেশটির হাতে প্রায় ১ হাজার ৬৪০ কোটি ডলারের রিজার্ভ ছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৭০০ কোটি ডলারের কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী, আগামী জুনের মধ্যে এই রিজার্ভকে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে পাকিস্তান সরকার। সৌদি আরবের এই নতুন ৩০০ কোটি ডলার সেই লক্ষ্য অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে।
কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে সম্প্রতি সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান পাকিস্তান সফর করেন। গত ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে তার আলোচনা হয়। পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি আরবের এই বিশেষ সহায়তা দেশের বৈদেশিক খাতের ভিত্তি মজবুত করতে এবং মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে কাজ করবে।
এই ইতিবাচক খবরের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক বন্ড বা ঋণপত্রের বাজারেও। দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের দর বেড়ে গত ফেব্রুয়ারি মাসের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। উল্লেখ্য যে, এর আগেও ২০১৮ সালে পাকিস্তান যখন চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল, তখন রিয়াদ ৬০০ কোটি ডলারের একটি বড় সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল।
বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও পাকিস্তানের অবস্থান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সহযোগিতা করছে পাকিস্তান, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে ইসলামাবাদ। এই বহুমুখী সম্পর্কের কারণেই সৌদি আরব বারবার পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
সৌদি আরবের এই সহায়তা পাকিস্তানের জন্য সাময়িক নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ করে দিলেও, দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ফাঁদ থেকে দেশটি কতটুকু বের হতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বারবার বিদেশি অনুদান বা আমানতের ওপর নির্ভর না করে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও কাঠামোগত সংস্কারের দিকে মনোযোগ না দিলে পাকিস্তানের অর্থনীতির এই নাজুক দশা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে। বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সাহায্য কেবল সাময়িক জোড়াতালি হিসেবে কাজ করে, কিন্তু টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।