আফগানিস্তানে ক্ষমতাসীন তালেবান সরকার এবার সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর এক কঠোর ও নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। নতুন এই আদেশে দেশটির যেকোনো স্তরের সরকারি কর্মীদের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নিয়ম সামান্যতম অমান্য করলে অপরাধীকে প্রচলিত আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি কঠোর শরিয়াহ দণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণার পর দেশটিতে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যার জেরে অনেক কর্মকর্তা শাস্তির ভয়ে নিজ হাতে নিজেদের ব্যবহৃত স্মার্টফোন ভেঙে ফেলছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য জানা গেছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আফগানিস্তানের বর্তমান প্রশাসন ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অবাধ তথ্যপ্রবাহ সীমিত করতে চরম পন্থা অবলম্বন করছে।
আফগানিস্তানের সামরিক আদালতের পক্ষ থেকে দেওয়া এক নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহ থেকেই দেশজুড়ে এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। এই আদেশের আওতা থেকে কেউ বাদ পড়বেন না। উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা, নিম্নপদস্থ কর্মচারী, সাধারণ মুজাহিদ থেকে শুরু করে যেকোনো ধরনের পরিষেবা প্রদানকারী কর্মীর জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যা এই নির্দেশনার ভয়াবহতা প্রমাণ করে। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, তালেবানের একজন পদস্থ কর্মকর্তা স্মার্টফোন ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত লিখিত আদেশটি উচ্চস্বরে পড়ে শোনাচ্ছেন। আর ঠিক তার পাশেই আরেকজন কর্মকর্তা ভারী বস্তু দিয়ে একের পর এক স্মার্টফোন ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন। নির্দেশনায় কঠোরভাবে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মীর কাছে স্মার্টফোন পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সেটি ধ্বংস করে দেওয়া হবে এবং ওই কর্মীর ওপর শরিয়াহভিত্তিক দণ্ড আরোপ করা হবে।
আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এই কঠোর নিয়ম থেকে যদি কাউকে কোনো ধরনের ছাড় পেতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই তালেবানের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার কাছ থেকে লিখিত বিশেষ অনুমতি বা ডিক্রি সংগ্রহ করতে হবে। অন্যথায় এই নিয়ম শিথিল করার বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ নেই।
আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান তাদের প্রতিবেদনে আরও জানিয়েছে, সামরিক আদালতের এই আদেশটি বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘বিক্ষিপ্তভাবে’ কার্যকর করা হচ্ছে। তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কিছু নির্দিষ্ট এলাকা ও প্রদেশে এই নির্দেশনার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ওপরও তা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নারী, সাধারণ বেসামরিক নাগরিক, চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত স্বাস্থ্যকর্মী, স্কুলশিক্ষক এবং এমনকি শিক্ষার্থীদের ওপরও জোরপূর্বক এই স্মার্টফোন নিষেধাজ্ঞার খড়্গ নেমে আসছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতা দখলের পর থেকেই তালেবান প্রশাসন তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির ডিজিটাল প্রভাব ঠেকাতে ধারাবাহিকভাবে নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করে আসছে। এবার সরাসরি স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রশাসনকে বাইরের দুনিয়ার আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার এক অভিনব ও কঠোর কৌশল হাতে নিয়েছে।