সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কাছে ভারতের তৈরি অত্যাধুনিক ‘ব্রহ্মস’ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির একটি বড় চুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতাপূর্ণ নিরাপত্তার বাজার হিসেবে পরিচিত মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র রপ্তানিকারক হিসেবে নিজেদের অবস্থান পাকা করতে ভারতের জন্য এটি একটি বড় মাইলফলক হতে পারে।
গত মাসে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দেশের মধ্যকার চলমান প্রতিরক্ষা আলোচনায় ভারতের স্বয়ংক্রিয় আকাশ প্রতিরক্ষা কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ‘আকাশতীর’ বিক্রির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চুক্তিটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তিপত্র সই না হলেও কৌশলগত দিক থেকে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ‘ব্রহ্মস’ মূলত একটি সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র (শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র)। এটি ভূমি, সমুদ্র কিংবা আকাশ—যেকোনো মাধ্যম থেকে নিক্ষেপ করা যায় এবং এটি শব্দের চেয়ে তিন গুণ দ্রুতগতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ বি শিভানে বলেন, এই চুক্তি ভারতের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দেবে। এটি ভারতকে শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারকের কাতার থেকে একজন বিকাশমান রপ্তানিকারক হিসেবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সাথে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। তিনি আরও জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ‘আকাশ’ ক্ষেপণাস্ত্র, ‘পিনাকা’ রকেট ব্যবস্থা, নিখুঁত নিশানার গোলাবারুদ এবং নৌ বা উপকূলীয় প্রতিরক্ষার জন্য ড্রোনের প্রতিও আগ্রহ দেখিয়েছে।
অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদয় চন্দ্রের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাত অত্যন্ত আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্রেতা এবং বর্তমানে তাদের কাছে মার্কিন ও ইউরোপীয়দের সেরা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রের এই ক্রয়াদেশ অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে ভারতীয় অস্ত্রের গুণগত মান ও গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করবে।
অন্যদিকে, সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর আবুধাবি তাদের আকাশসীমা ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে বেশ চিন্তিত। এ কারণে তারা তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে তৎপর হয়ে উঠেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার সঞ্জয় আইয়ার বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আবুধাবির নীতিনির্ধারকেরা তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য সম্পূর্ণভাবে ওয়াশিংটন বা প্যারিসের ওপর নির্ভরশীল হতে চান না। তুলনামূলক কম রাজনৈতিক শর্তে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র পাওয়ায় তারা ভারতের দিকে ঝুঁকছেন।
এই চুক্তিটি সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিপরীতে ভারতের জন্য একটি কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে। গত বছর সমাপ্ত হওয়া অর্থ বছরে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬২ দশমিক ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড ৪ দশমিক ১১ বিলিয়ন (৪১১ কোটি) মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ (ভারতে তৈরি করো) উদ্যোগের হাত ধরে ভারত ধীরে ধীরে কেবল অস্ত্র আমদানিকারক থেকে একটি নির্ভরযোগ্য অস্ত্র সরবরাহকারী দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে।