পূর্ব ইউরোপের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইউক্রেনে আবারও ভয়াবহ তাণ্ডব চালিয়েছে রাশিয়া। রাজধানী কিয়েভকে মূল লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে চালানো ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযানের (রিমোট নিয়ন্ত্রিত বিমান) এই হামলায় অন্তত চারজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৮৩ জন সাধারণ মানুষ। রোববারের এই আকস্মিক হামলায় দেশটিতে নতুন করে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং বহু আবাসিক স্থাপনা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
সপ্তাহের ছুটির দিন রোববারের ভোররাত। যখন সাধারণ মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই রাজধানী কিয়েভ ও এর আশপাশের এলাকার আকাশ বিদারণ করে বেজে ওঠে বিপৎসংকেত। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একের পর এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো শহর। ইউক্রেনের রাষ্ট্রপ্রধান ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, এবারের হামলায় মূলত রাজধানী কিয়েভকেই সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই ভয়াল হামলায় সাধারণ মানুষের আবাসিক ভবন, বিদ্যালয় এবং দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হামলার ভয়াবহতা তুলে ধরে ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শনিবার সন্ধ্যা থেকে শুরু করে রোববার পর্যন্ত রাশিয়া অন্তত ৯০টি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৬০০টি বিস্ফোরকবাহী চালকবিহীন আকাশযান ছুড়েছে। তবে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজেদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা ব্যবহার করে এর মধ্যে ৫৫টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৫৪৯টি চালকবিহীন আকাশযান মাঝপথেই ধ্বংস করে দিতে বা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তা সত্ত্বেও যে পরিমাণ বিস্ফোরক দেশের মাটিতে আঘাত হেনেছে, তাতেই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সাধিত হয়েছে।
ইউক্রেনের জাতীয় পুলিশ বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেবল রাজধানী কিয়েভেই ৫০টির বেশি স্থানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ মানুষের বসবাসের বহুতল ভবন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার বৃহৎ বিপণিবিতান এবং জরুরি সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর কার্যালয়ও রয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে এবং আগুন নেভাতে দমকল বাহিনী ও উদ্ধারকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
এদিকে, এই ধ্বংসযজ্ঞের পক্ষে সাফাই গেয়েছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মস্কোর দাবি, ইউক্রেন সম্প্রতি তাদের সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য অবকাঠামোতে যে আঘাত হেনেছে, মূলত তার চূড়ান্ত প্রতিশোধ নিতেই এই পাল্টা সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। কিছুদিন আগেই রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান ভ্লাদিমির পুতিন অভিযোগ করেছিলেন যে, ইউক্রেনীয় বাহিনী শুক্রবার স্তারোবিলস্ক শহরের একটি ছাত্রাবাসে হামলা চালিয়ে ২১ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। যদিও ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা কোনো সাধারণ মানুষের ওপর নয়, বরং রুশ সামরিক বাহিনীর একটি ঘাঁটিকে লক্ষ্য করেই ওই হামলা চালিয়েছিল।
এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাশিয়ার ব্যবহৃত নতুন একটি মারণাস্ত্র। মস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, তারা এবারের হামলায় ‘ওরেশনিক’ নামের একটি নতুন প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি অতিশব্দীয় বা শব্দের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি দ্রুতগামী মারণাস্ত্র (যা শব্দের গতির চেয়ে অন্তত দশ গুণ বেশি বেগে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে)। এই অস্ত্রটি একই সঙ্গে পারমাণবিক ও সাধারণ—উভয় ধরনের বিস্ফোরক বহনে সক্ষম, যা একে চরম বিধ্বংসী করে তুলেছে।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রপ্রধান জেলেনস্কি আগেই দেশবাসীকে সতর্ক করেছিলেন যে, রাশিয়া একটি বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং তারা এই নতুন ‘ওরেশনিক’ অস্ত্রটি ব্যবহার করতে পারে। তিনি প্রাথমিকভাবে দাবি করেন যে, কিয়েভ অঞ্চলের বিল্যা তসেরকভা শহরে এই নতুন অস্ত্রটি নিক্ষেপ করা হয়েছে। তবে হামলার ধ্বংসযজ্ঞ এতটাই ব্যাপক ছিল যে, ঠিক কোন ধরনের অস্ত্র দিয়ে এই নির্দিষ্ট হামলাটি হয়েছে, তা পরে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপ্রধানের কার্যালয় থেকে নিশ্চিতভাবে জানানো সম্ভব হয়নি। পুরো ঘটনার তদন্ত চলছে বলে তারা জানিয়েছেন।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এখন এক ভয়ংকর প্রতিশোধের চক্রে পরিণত হয়েছে। একে অপরকে দোষারোপ করে সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় ক্রমাগত যে হামলা চলছে, তার চূড়ান্ত ও অসহায় শিকার হচ্ছেন কেবলই সাধারণ নিরীহ মানুষ। শব্দের চেয়ে দ্রুতগামী নতুন নতুন মারণাস্ত্রের ব্যবহার কেবল এই যুদ্ধের ভয়াবহতাকেই বাড়াচ্ছে না, বরং পুরো ইউরোপের নিরাপত্তাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া শিশুদের কান্না বা স্বজন হারানো মানুষের আর্তনাদ কি বিশ্বনেতাদের বিবেককে নাড়া দিতে পারছে? প্রতিশোধের এই অন্ধ খেলায় অস্ত্রের ঝনঝনানি থামিয়ে আলোচনার টেবিলে না বসলে, আগামী দিনগুলোতে মানবসভ্যতাকে হয়তো এর চেয়েও বড় কোনো মানবিক বিপর্যয়ের সাক্ষী হতে হবে।