যুদ্ধবিরতির জল্পনার মধ্যেই ইউক্রেনজুড়ে ভয়াবহ তান্ডব চালিয়েছে রুশ বাহিনী। রাতভর চালানো এই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে রয়েছে নিষ্পাপ শিশুও। রাশিয়ার এই আকস্মিক ও বিশাল আক্রমণ ইউক্রেনীয় শহরগুলোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।
ইউক্রেনের আকাশসীমায় রাশিয়ার পক্ষ থেকে এক বিভীষিকাময় রাত নেমে এসেছিল। রুশ সামরিক বাহিনী প্রায় ৭০০-র বেশি ড্রোন (চালকবিহীন বিমান) এবং ৪৪টি ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনের বিভিন্ন জনপদ লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করে। এই আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল রাজধানী কিয়েভ, গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ওডেসা এবং শিল্পসমৃদ্ধ শহর দিনিপ্রো। স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলায় প্রাণহানির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
রাজধানী কিয়েভে মাঝরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন সতর্ক সংকেত বা সাইরেন বেজে ওঠে, তার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ। রাশিয়ার একটি ড্রোন সরাসরি একটি বহুতল আবাসিক ভবনে আঘাত হানলে সেটি তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বেশ কয়েকজনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন, যার মধ্যে ১২ বছর বয়সী এক শিশুর নিথর দেহও রয়েছে।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনী দাবি করেছে, তারা আকাশপথে আসা ৬০০-র বেশি ড্রোন এবং অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে অন্তত ২৬টি ক্ষেপণাস্ত্র নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। এর ফলে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি বিশাল এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অন্ধকারে নিমজ্জিত শহরগুলোতে উদ্ধার কাজ চালাতে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবীদের।
এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বিশ্বনেতাদের প্রতি কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কোনো অবকাশ নেই, বরং তা আরও কঠোর করা উচিত। তিনি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (এক ধরনের শক্তিশালী দূরপাল্লার অস্ত্র) প্রতিহত করতে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতির কথা উল্লেখ করে দ্রুত সামরিক সহায়তা চেয়েছেন।
অন্যদিকে, ইউক্রেনও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। পাল্টা হামলায় রাশিয়ার ক্রাসনোদার অঞ্চলে প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে যখন আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে শান্তি ফেরানোর চেষ্টা চলছে, ঠিক তখন এই পাল্টাপাল্টি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ পুরো প্রক্রিয়াকেই অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তব চিত্র বলছে সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
যুদ্ধের দামামা যখন থামার কথা, তখন শত শত ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্রের এই বৃষ্টি কেবল সাধারণ মানুষের প্রাণই কেড়ে নিচ্ছে না, বরং মানবতাকে চরম সংকটে ফেলছে। যুদ্ধের ময়দানে কোনো পক্ষেরই চূড়ান্ত জয় বা পরাজয় হয়তো শিগগির আসবে না, কিন্তু মাঝখান থেকে অসংখ্য পরিবার হারাবে তাদের প্রিয়জনদের। বিশ্ববিবেকের উচিত কেবল নিন্দা না জানিয়ে অবিলম্বে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে এই অহেতুক রক্তপাত বন্ধ করা।