মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মহামারি আকার ধারণ করার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন টিকার প্রত্যাশা বাড়ছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ভাইরাসের বিস্তার রোধে কার্যকর টিকা জনসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী হতে অন্তত আরও নয় মাস সময় প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞ ও উপদেষ্টা ড. ভাসি মূর্তি জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, বর্তমানে ইবোলা ভাইরাসের ‘বুন্ডিবুগিও’ প্রজাতির সংক্রমণ মোকাবিলায় দুটি সম্ভাব্য প্রতিষেধক বা টিকা তৈরির কাজ চলছে। তবে এই টিকাগুলো এখনো চূড়ান্ত পরীক্ষার বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। টিকা গবেষণা ও এর প্রয়োগিক ফলাফল নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যার ফলে এটি বাজারে আসতে বা ব্যবহারের উপযোগী হতে প্রায় নয় মাস সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এখন পর্যন্ত ইবোলার উপসর্গ নিয়ে প্রায় একশ ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া আরও ছয়শ জনের শরীরে এই রোগের লক্ষণ শনাক্ত করা হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৫১ জনের ইবোলায় আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি এবং উত্তর কিভু প্রদেশের বাসিন্দারাই মূলত এই সংক্রমণের শিকার হয়েছেন। সংক্রমণের ভয়াবহতা শুধু কঙ্গোর সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; প্রতিবেশী দেশ উগান্ডার রাজধানীতেও ইতিমধ্যে দুজন ইবোলা রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
ইবোলার ভয়াবহ বিস্তার নিয়ন্ত্রণে গত ১৭ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। যদিও সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি এখনো বিশ্বজুড়ে মহামারি পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবে সংক্রমণের যে গতি তাতে সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই। ইবোলা অত্যন্ত প্রাণঘাতী এবং ভাইরাসজনিত এই রোগটি দ্রুত ছড়ায়, তাই এর প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর টিকা ও জনসচেতনতার বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকা প্রস্তুত হওয়ার আগ পর্যন্ত সংক্রমণ ঠেকাতে আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত আইসোলেশন (বিচ্ছিন্নকরণ) এবং স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে পালন করা জরুরি। ড. ভাসি মূর্তির বক্তব্য অনুযায়ী, ল্যাবরেটরি থেকে মাঠপর্যায়ে টিকাকে সফলভাবে পৌঁছে দিতে যে দীর্ঘ সময় ও গবেষণার প্রয়োজন, তা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। কঙ্গোর মতো দুর্গম অঞ্চলে চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো এবং আক্রান্তদের শনাক্ত করে তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের দ্রুত নজরদারিতে আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজ্ঞানের জয়যাত্রা সত্ত্বেও ইবোলার মতো মরণঘাতী ভাইরাসের ক্ষেত্রে আমরা এখনো অনেকটা অসহায়। একটি প্রতিষেধক বা টিকা তৈরির দীর্ঘসূত্রতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভাইরাস কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ থাকে না। কঙ্গোর এই প্রাদুর্ভাব বিশ্ববাসীর জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুততর প্রতিক্রিয়া দেখানোর মতো সক্ষমতা অর্জনই এখন সময়ের দাবি। টিকা বাজারে আসার দীর্ঘ অপেক্ষায় পৃথিবী কতটুকু নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে এখনই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।