মধ্যপ্রাচ্যের বারুদের স্তূপে যেন নতুন করে আগুন উসকে দিল ইসরায়েল। ইরানের হাতে মজুত থাকা পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রধান উপাদান ‘ইউরেনিয়াম’ পুরোপুরি অপসারণ না করা পর্যন্ত চলমান যুদ্ধ কোনোভাবেই থামবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ইসরায়েলের কট্টরপন্থি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তার এমন অনড় অবস্থান ও কড়া বার্তার পর এই অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা চরম আকার ধারণ করেছে।
রক্তক্ষয়ী এক দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য। বর্তমানে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চললেও, ভেতরে ভেতরে যে যুদ্ধের উত্তাপ একটুও কমেনি, তা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠল ইসরায়েলের শীর্ষ নেতার মন্তব্যে। রোববার (১০ মে) যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সংবাদমাধ্যম ‘সিবিএস নিউজ’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তার ভবিষ্যৎ যুদ্ধপরিকল্পনা এবং মূল লক্ষ্যের কথা নির্দ্বিধায় তুলে ধরেন।
সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন, "আমার মনে হয় চলমান এই সংঘাত থেকে আমরা ইতিমধ্যেই আমাদের অনেক সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছি। বর্তমানে হয়তো মাঠে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, যতদিন পর্যন্ত ইরানের হাতে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অপসারণ বা ধ্বংস না করা হবে, ততদিন এই যুদ্ধ চলবে। যেকোনো মূল্যে ইরানের ওই ইউরেনিয়াম অপসারণ করতেই হবে।"
নেতানিয়াহুর এই তীব্র উদ্বেগের পেছনে রয়েছে একটি ভয়ংকর পরিসংখ্যান। জাতিসংঘের পরমাণু প্রকল্প পর্যবেক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক অঙ্গসংস্থা ‘আইএইএ’-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় চারশ কেজি ইউরেনিয়ামের (তেজস্ক্রিয় রাসায়নিক পদার্থ, যা পারমাণবিক চুল্লি ও বোমা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়) এক বিশাল মজুত রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ইউরেনিয়াম ইতিমধ্যেই ষাট শতাংশ পর্যন্ত বিশুদ্ধ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিশুদ্ধতার মাত্রাকে যদি কোনোভাবে নব্বই শতাংশে উন্নীত করা যায়, তবে তা দিয়ে খুব সহজেই একের পর এক ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব। ইসরায়েল মনে করে, ইরান সেই পথেই এগোচ্ছে।
পরমাণু অস্ত্র তৈরির এই সম্ভাব্য পথ বন্ধ করতে ইসরায়েল কি সরাসরি ইরানে সামরিক হামলা চালাবে বা বলপ্রয়োগ করবে? সংবাদমাধ্যমের এমন সরাসরি প্রশ্নের জবাবে নেতানিয়াহু অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নেন। তিনি বলেন, "আমি এখনই এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেব না। কারণ, আমাদের সামরিক সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ আক্রমণ পরিকল্পনা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত এমন অত্যন্ত গোপনীয় কোনো বিষয় নিয়ে আমি প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি নই।"
তবে সামরিক অভিযান যে একেবারেই হয়নি, তা নয়। গত বছরের জুন মাসে ‘আইএইএ’ যখন ইরানের এই ইউরেনিয়াম মজুতের তথ্য বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করে, ঠিক তখনই ওই ইউরেনিয়ামের নিয়ন্ত্রণ নিতে ইরানে অত্যন্ত গোপনীয় ও যৌথ সামরিক অভিযান চালিয়েছিল ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র। টানা বারো দিন ধরে চলা সেই গভীর শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে ইরানের পরমাণু প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। কিন্তু এত কিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলি বাহিনী সেই কাঙ্ক্ষিত ইউরেনিয়ামের মজুতের কোনো সন্ধান বের করতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি সংবাদমাধ্যম ‘সিএনবিসি’-কে দেওয়া অপর এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইরান এখনো তাদের মাটির নিচে থাকা গভীর ও গোপন স্থাপনাগুলোতে ইউরেনিয়াম বিশুদ্ধকরণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন যে, ইসরায়েলি হামলার কারণে তাদের সেই কাজের গতি বা সক্ষমতা হয়তো কিছুটা কমেছে, কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
তাহলে এই ভয়ংকর ইউরেনিয়াম কীভাবে অপসারণ করা সম্ভব? এই প্রশ্নের জবাবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী কূটনীতি ও সামরিক—উভয় পথের দিকেই ইঙ্গিত করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্যের সূত্র ধরে বলেন, "যদি ইরানের সঙ্গে বিশ্বনেতাদের কোনো শক্ত চুক্তি হয়, তবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সেখানে গিয়ে সরাসরি ইউরেনিয়াম নিয়ে আসা যেতে পারে। আর সামরিক পরিকল্পনার কথা তো আমি আগেই বলেছি, সেটা এখানে প্রকাশ করার বিষয় নয়।"
সবশেষে এই যুদ্ধ কবে থামবে, এমন প্রশ্নের জবাবে নেতানিয়াহু পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে তার কাছে যুদ্ধ থামানোর কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। তার একমাত্র শর্ত, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে হলে সবার আগে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিতে হবে।
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ বিশ্বযুদ্ধের একটি অশনিসংকেত। ইরান ও ইসরায়েলের এই চিরশত্রুতা দীর্ঘদিনের হলেও, পারমাণবিক অস্ত্রের ইস্যুটি একে এক ভিন্ন ও ভয়ংকর মাত্রায় নিয়ে গেছে। ইসরায়েল যদি ইউরেনিয়াম ধ্বংসের অজুহাতে ইরানের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি বড় ধরনের আক্রমণ চালায়, তবে ইরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। এর ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য একটি পারমাণবিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে, যার মাশুল গুনতে হবে গোটা বিশ্বকে। এমন এক ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি এড়াতে জাতিসংঘ ও বিশ্বের পরাশক্তিগুলোকে এখনই কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে। অস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে নয়, বরং গঠনমূলক আলোচনা ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমেই কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করা সম্ভব।