ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতা নিরসনে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও সমঝোতার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও যেকোনো শর্তে তেহরানের সঙ্গে চুক্তি সই করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে বৈস্ময়কর বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের সম্ভাব্য কর বা ফি আরোপের পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছে ওয়াশিংটন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
শুক্রবার (২৬ জুন) বাহরাইনে জিসিসি (উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ) ভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে একটি অর্থবহ চুক্তি চাই, তবে তা যেকোনো মূল্য চুকিয়ে নয়। আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে এমন কোনো চুক্তি হবে না যা উপসাগরীয় অঞ্চলে আমাদের দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছায়। এই সমঝোতার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ জ্বালানি পরিবহন নিশ্চিত করা। তবে তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র) কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি গোষ্ঠী (আঞ্চলিক অনুগত সশস্ত্র দল) গুলোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের বিষয়টি এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার অন্তর্ভুক্ত হবে কি-না, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। বাহরাইনের বৈঠক শেষে জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর বৈরী আচরণের স্থায়ী সমাধান অত্যন্ত জরুরি।
এমন রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজ অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের (উড়ন্ত বস্তু) আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, হামলায় জাহাজটির ওপরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো আরোহী হতাহত হননি। এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার পর জাতিসংঘের আইএমও (আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা) মহাসচিব আরসেনিও ডোমিঙ্গেজ নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনা করে ওই অঞ্চলে আটকে পড়া প্রায় ৬০০ বাণিজ্যিক জাহাজ সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও আরও জোর দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ। এই প্রণালির ওপর কোনো একক দেশ কর আরোপ বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। যদি এই বৈশ্বিক উন্মুক্ত জলপথের নীতি ভেঙে যায়, তবে বিশ্বজুড়ে নৌবাণিজ্যে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। যদিও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি দাবি করেছেন, ওমান বা ইরান নতুন কোনো ট্রানজিট ফি (পণ্য পারাপার শুল্ক) আরোপ করছে না। তবে দুই দেশ পূর্বে জানিয়েছিল যে তারা প্রণালিতে প্রদত্ত বিভিন্ন পরিষেবার জন্য সম্ভাব্য নতুন চার্জ বা সেবা মূল্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে। গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত মার্কিন-ইরান সমঝোতা চুক্তিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে আগামী ৬০ দিন সম্পূর্ণ বিনা খরচে এই জলপথ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হলেও, এই সময়সীমার পর কী ঘটবে তা এখনও অনিশ্চিত।