মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো রণক্ষেত্র তৈরি না করার দাবি জানিয়ে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে সরব হয়েছেন সাবেক সেনা সদস্যরা। ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের দাবিতে ক্যাপিটল হিলে বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে অন্তত ৬০ জন আন্দোলনকারীকে পুলিশ আটক করেছে।
সোমবার ওয়াশিংটন ডিসির কংগ্রেস ভবনের আওতাধীন ক্যানন হাউস অফিস বিল্ডিংয়ে এক নজিরবিহীন বিক্ষোভের সাক্ষী হয় বিশ্ববাসী। ‘অ্যাবাউট ফেস’ (দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো) নামক একটি সংগঠনের ব্যানারে আয়োজিত এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও বর্তমান সেনাদের পরিবারের সদস্যরা। তাদের দাবি একটাই—ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়ানো চলবে না।
আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে পরিস্থিতিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা স্পষ্টভাবে জানান, যুদ্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের (মার্কিন আইনসভা) হাতে থাকলেও আইনপ্রণেতারা এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। বিক্ষোভকারীদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে কংগ্রেসকে আরও কঠোর এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক সাবেক সেনাসদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কংগ্রেসের হাতে যুদ্ধের রাশ টেনে ধরার ক্ষমতা আছে, কিন্তু তারা কী করছে? ক্যালিফোর্নিয়া থেকে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের এখানে আসতে হয়েছে শুধু এটি মনে করিয়ে দিতে যে তারা যেন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
আরেকজন প্রবীণ যোদ্ধা অতীতের স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, “ইরাক যুদ্ধের আগে মার্কিন প্রশাসন যেসব অজুহাত এবং যুক্তি দিয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তার অদ্ভুত মিল রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে বারবার একই ধরনের মিথ্যা যুক্তির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশ আন্দোলনকারীদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও সাবেক সেনারা পিছু হটেননি। তারা একে অপরের হাত ধরাধরি করে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান। পরিস্থিতি এক পর্যায়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ জোরপূর্বক তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং অর্ধশতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর কংগ্রেস ভবন চত্বরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।
বিক্ষোভে সংহতি জানাতে আসা বর্তমান সেনাদের স্বজনরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই অপ্রয়োজনীয় সংঘাতের ফলে হাজার হাজার সাধারণ সৈনিকের প্রাণ ঝুঁকিতে পড়ছে। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক ইগো বা জেদের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধে জড়ানো হলে তার চড়া মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। তাই দ্রুত রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানান তারা।
এই বিক্ষোভ কেবল একটি সাধারণ প্রতিবাদ নয়, বরং এটি সেই সব মানুষের হাহাকার যারা যুদ্ধের ভয়াবহতা কাছ থেকে দেখেছেন। দীর্ঘদিনের ইরাক ও আফগান যুদ্ধের ক্ষত এখনো মার্কিন সমাজ থেকে মুছে যায়নি। সাবেক সেনাদের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, সামরিক শক্তি প্রদর্শনই সবসময় দেশপ্রেমের পরিচয় নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় রক্তপাত এড়ানোই প্রকৃত বীরত্ব। মার্কিন নীতিনির্ধারকরা কি এই অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের সতর্কবার্তায় কর্ণপাত করবেন, নাকি আবারও একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে পা বাড়াবেন—তা সময় ও বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটেই পরিষ্কার হবে।