যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বা মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ) মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন এবং অপ্রত্যাশিত মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিনের অবিচ্ছেদ্য মিত্র হওয়া সত্ত্বেও এই ঐতিহাসিক চুক্তিকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে চরম মাত্রায় মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল রূপ নিয়েছে যে, দুই দেশের মধ্যকার গভীর কূটনৈতিক সম্পর্ক বর্তমানে একটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক হারলান উলম্যান এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক পদক্ষেপে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং যেকোনো মূল্যে তিনি এই শান্তি চুক্তিটি ভেঙে দিতে চাইছেন। উলম্যানের মতে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে বর্তমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্মরণকালের সবচেয়ে বড় টানাপোড়েন এবং চ্যালেঞ্জের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
এখন পর্যন্ত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে এই চুক্তির কোনো কড়া সমালোচনা করেননি। তবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের গভীর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে তার চরম অসন্তোষের কথা। নেতানিয়াহুর এই রহস্যময় নীরবতার পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী অক্টোবর মাসে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নেতানিয়াহু গভীরভাবে আশঙ্কা করছেন, চিরশত্রু ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই নমনীয় অবস্থান এবং সমঝোতা আসন্ন নির্বাচনে তার পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কারণ, ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ও আগ্রাসী অবস্থানই দীর্ঘদিন ধরে তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্যতম প্রধান মূলধন।
অন্যদিকে, মিত্রদেশের এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আগ্রাসী একটি কৌশল অবলম্বন করেছেন। বিশ্লেষক উলম্যানের মতে, ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে দিয়ে একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের নীতি নির্ধারণসহ সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি এখন এককভাবে তার হাতেই রয়েছে। মিত্র হলেও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বৈদেশিক সিদ্ধান্তের ওপর অযাচিত প্রভাব খাটানোর কোনো সুযোগ যে ইসরায়েলের নেই, সেটিই ট্রাম্প কঠোরভাবে প্রমাণ করতে চাইছেন।
বিশ্লেষক হারলান উলম্যান আরও মনে করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে এমন প্রকাশ্য বার্তা দেন এবং নিজের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব প্রদর্শন করেন, তখন তা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিশাল প্রভাব ফেলে। এর ফলে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা আগের চেয়ে আরও বেশি উৎসাহিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন। আসন্ন অক্টোবরের নির্বাচনে এর একটি সুদূরপ্রসারী ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের সুস্পষ্ট অভিমত হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর এই বিপরীতমুখী অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রার উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। মিত্রদের এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই শেষ পর্যন্ত ওই অঞ্চলের শান্তিতে কেমন প্রভাব ফেলে, বিশ্ব সম্প্রদায় এখন সেদিকেই সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।