ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক সরঞ্জামের মজুতে বড় ধরনের টান পড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এশিয়া ও ইউরোপের ঘাঁটিগুলো থেকে অস্ত্র সরিয়ে এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাতে হচ্ছে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তরকে।
প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের সাথে দীর্ঘায়িত যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী মজুত থাকা আধুনিক সামরিক সরঞ্জামের একটি বিশাল অংশ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে পেন্টাগন (যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর) এখন অনেকটা নিরুপায় হয়েই বিভিন্ন মহাদেশ থেকে তাদের মজুত সরঞ্জাম সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করছে।
যদিও হোয়াইট হাউস (যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির কার্যালয়) এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধের সঠিক আর্থিক ব্যয় বা ক্ষয়ক্ষতির কোনো আনুষ্ঠানিক খতিয়ান প্রকাশ করেনি, তবে আন্তর্জাতিক দুটি স্বতন্ত্র গবেষণা সংস্থা এই যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে ভয়াবহ তথ্য দিয়েছে। সংস্থা দুটির দাবি অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০ কোটি ডলার খরচ হচ্ছে। যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি থেকে ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের ঘরে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বর্তমান রণক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মরণাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের (প্রিসিশন-স্ট্রাইক মিসাইল)। এছাড়াও ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র (এটিএসিএমএস) এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র নিরোধক ব্যবস্থার (প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মিসাইল) মজুতও প্রায় শেষের পথে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মতো একটি শক্তিশালী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার সমর শক্তির এক বিশাল অংশ ক্ষয় করে ফেলেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আধিপত্য বজায় রাখার জন্য যে বিপুল অস্ত্রের মজুত আমেরিকা গড়ে তুলেছিল, তা এখন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এর ফলে এশিয়া ও ইউরোপীয় অঞ্চলে আমেরিকার প্রতিরক্ষা বলয় দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের কর্মকর্তারা এখন দিনরাত কাজ করছেন কীভাবে এই শূন্যতা পূরণ করা যায়। তবে অত্যাধুনিক এসব ক্ষেপণাস্ত্র ও সরঞ্জাম দ্রুত সময়ের মধ্যে তৈরি করা প্রায় অসম্ভব, কারণ এর উৎপাদন প্রক্রিয়া যেমন জটিল, তেমনি সময়সাপেক্ষ। ফলে মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এই যুদ্ধ কেবল ইরান বা আমেরিকার ভাগ্য নির্ধারণ করছে না, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে উলট-পালট করে দিচ্ছে। যে আমেরিকা এতদিন বিশ্বজুড়ে অস্ত্র আর শক্তির দাপট দেখিয়েছে, তাদের ভাণ্ডারেও আজ টান পড়েছে। যুদ্ধের এই বিপুল আর্থিক ও সামরিক ব্যয় শেষ পর্যন্ত সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের করের টাকার ওপর কতটুকু চাপ ফেলে এবং বিশ্ব শান্তিকে কোন পরিণতির দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।