মধ্যপ্রাচ্যে ঘনীভূত হওয়া যুদ্ধের মেঘ এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নেওয়ার উপক্রম হয়েছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার জেরে এবার সরাসরি রণক্ষেত্রে নামছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষায়িত স্থল বাহিনী। প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন মেরিন সেনার একটি চৌকস দল ইতিমধ্যেই রণতরী নিয়ে ইরানের অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৩১তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিটের (একটি বিশেষায়িত সামরিক দল যারা জল ও স্থল উভয় স্থানে যুদ্ধ করতে সক্ষম) সদস্যরা জাপানের ওকিনাওয়া বন্দর থেকে তাদের যাত্রা শুরু করেছে। এই বিশাল সেনাদলটি ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’ নামক একটি উভচর যুদ্ধজাহাজে করে রওনা দিয়েছে। ওকিনাওয়ায় মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি থেকে এই সেনাদলটির মোতায়েন হওয়াকে সামরিক বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
মূলত ইউএসএস ত্রিপোলি এমন একটি যুদ্ধজাহাজ যা থেকে মেরিন সদস্যদের সরাসরি শত্রু সীমানায় নামিয়ে দেওয়া সম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কোনো কৌশলগত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া কিংবা যেকোনো জরুরি সংকট মোকাবিলায় এই বাহিনীকে ব্যবহার করা হতে পারে। যুদ্ধ বিশ্লেষকদের মতে, এতদিন মার্কিন সামরিক সহায়তা মূলত আকাশপথ এবং নৌপথের তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, আড়াই হাজার স্থল সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
উল্লেখ্য যে, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এটিই প্রথম মার্কিন স্থল বাহিনীর সরাসরি মোতায়েন। যদিও মার্কিন মেরিন সেনারা জল ও স্থল উভয় স্থানেই কাজ করতে পারদর্শী, তবে তাদের এই অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য হতে পারে ইরানের অভ্যন্তরীণ কোনো লক্ষ্যবস্তুতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা। দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা চললেও সরাসরি পদাতিক সেনা পাঠানোর এই পদক্ষেপ এটাই প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন এই সংঘাতকে বেশ দীর্ঘমেয়াদী এবং বিপজ্জনক হিসেবে দেখছে।
বর্তমানে ইউএসএস ত্রিপোলি এবং এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজগুলো দ্রুতগতিতে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সেনাদলের মোতায়েন কেবল একটি সামরিক শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং এটি ইরানের প্রতি একটি কঠোর বার্তাও বটে। মার্কিন প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তাদের মিত্র ইসরায়েলের ওপর কোনো ধরনের বড় হামলা হলে কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে দ্বিধাবোধ করবে না।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিশাল সেনাদল মোতায়েন করার অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে চায়। ওকিনাওয়ার ঘাঁটি থেকে এই বিশাল দূরত্ব পাড়ি দিয়ে সেনাদল পাঠানোর পেছনে একটি বড় কৌশলগত পরিকল্পনা কাজ করছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত তাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ কতটা বিস্তৃত। মূলত ইরানকে চারদিক থেকে চাপে রাখার একটি বড় অংশ হিসেবে এই স্থল বাহিনীকে মোতায়েন করা হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, সরাসরি স্থল সেনা মোতায়েন করার ফলে এই অঞ্চলে যুদ্ধের ব্যাপ্তি আরও বাড়তে পারে। এটি কেবল ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন কৌশলী অবস্থান থেকে এটি স্পষ্ট যে, তারা খুব দ্রুত এই সংঘাত শেষ করার কোনো পরিকল্পনা করছে না, বরং নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বিস্তারের পথে হাঁটছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মেরিন সেনাদের এই মোতায়েন বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। যেখানে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে শান্তি স্থাপনের কথা ছিল, সেখানে আড়াই হাজার পদাতিক সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত যুদ্ধের আগুনকে আরও উসকে দিতে পারে। এটি কেবল ইরান নয়, বরং পুরো অঞ্চলের সার্বভৌমত্বের জন্য একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংঘাত যদি শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ স্থল যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তার ভয়াবহতা থেকে বিশ্ব অর্থনীতি বা বিশ্বশান্তি কোনোটিই নিরাপদ থাকবে না। এখন দেখার বিষয়, তেহরান এই সামরিক উসকানির জবাবে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই আসন্ন বিপর্যয় রুখতে কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।