দশকের পর দশক ধরে চলা ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে এবার সরাসরি মাঠে নেমেছে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ ফ্রান্স। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন এবং দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের (স্বাধীন ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের পাশাপাশি অবস্থান) রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করতে আগামী সপ্তাহে প্যারিসে বসছে এক বিশেষ শান্তি বৈঠক।
দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের খোঁজে এবার জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে ফ্রান্স। বহুল আলোচিত দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথরেখা চূড়ান্ত করতে আগামী সপ্তাহে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে মিলিত হবেন ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য হলো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় এবং তা প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়া।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারোত এই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে আয়োজিত ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের এক যৌথ সমাবেশে পাঠানো একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘোষণা দেন।
আগামী ১২ জুন প্যারিসে এই বিশেষ শান্তি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারোত এই উদ্যোগকে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে অত্যন্ত যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি তার বার্তায় বলেন, এই ঐতিহাসিক বৈঠকে দুই পক্ষের নাগরিক সমাজের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। তাদের উপস্থিতিতে দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে সম্মিলিত অঙ্গীকার রয়েছে, তা আরও একবার দৃঢ়ভাবে পুনর্ব্যক্ত করা হবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যার একটি বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। মূলত ‘প্যারিস আবেদন’ (প্যারিস অ্যাপিল) চালুর এক বছর পূর্তি এবং ফ্রান্সসহ বিশ্বের প্রায় দশটি দেশের স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এই বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়েছে। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই পদক্ষেপকে বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ফ্রান্সের পরিকল্পনা কেবল এই বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। জানা গেছে, ১২ জুনের এই আলোচনা থেকে যে সুপারিশমালা তৈরি হবে, তা চলতি বছর ফ্রান্সে অনুষ্ঠিতব্য শিল্পোন্নত সাত দেশের জোটের (জি-৭) শীর্ষ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হবে। এর ফলে ফিলিস্তিন ইস্যুটি বিশ্বনেতাদের আলোচনার মূল টেবিলে আরও জোরালোভাবে জায়গা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বারোত এই প্রসঙ্গে বলেন, "আমাদের লক্ষ্য একদম পরিষ্কার। আমরা এমন একটি নতুন বৈশ্বিক কর্মসূচির সূচনা করতে চাই, যা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি এবং এর কার্যকর বাস্তবায়নকে দ্রুত এগিয়ে নেবে। এখানে নাগরিক সমাজের ভূমিকা অপরিহার্য, কারণ মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না।"
শান্তি প্রতিষ্ঠায় সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সংগঠনগুলোর ভূমিকার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের চেয়ে স্থানীয় অধিকারকর্মী ও সংগঠনগুলোই ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি সাধারণ মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন, তাদের মনের আকাঙ্ক্ষা এবং বেঁচে থাকার উদ্বেগগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে।
প্যারিস বৈঠকের মূল আলোচনা মূলত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। এগুলো হলো—প্রথমত, ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি উভয় পক্ষের সাধারণ মানুষের জীবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজার দ্রুত পুনর্গঠন। তৃতীয়ত, দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের দ্রুত বাস্তবায়ন এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড জোরপূর্বক দখল বা সংযুক্ত করার যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ। চতুর্থত, সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে জনমত গড়ে তোলা। এবং পঞ্চমত, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, সংস্কার এবং আঞ্চলিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করা।
এই পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘নিউইয়র্ক ঘোষণা’-তে (নিউইয়র্ক ডিকলারেশন) উল্লেখিত নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে বলে জানা গেছে। ফ্রান্স মনে করে, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ তৈরি করবে। সবশেষে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাস্তবতার কঠিন চিত্র তুলে ধরে বলেন, "আমাদের সামনের এই চ্যালেঞ্জটি বিশাল ও অত্যন্ত কঠিন। তবে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো—ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন, এই দুটি রাষ্ট্র যেন পূর্ণ নিরাপত্তা ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিয়ে একে অপরের পাশাপাশি স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করা।"
দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের এই রক্তাক্ত সংঘাত বিশ্ববিবেকের কাছে একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে আছে। ফ্রান্সের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়। তবে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মতো জটিল ভূ-রাজনৈতিক সংকটে কেবল আলোচনা বা নাগরিক সমাজের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরাশক্তিগুলোর নিরপেক্ষ ও সৎ ভূমিকা এবং ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতির ওপর দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ। জি-৭ সম্মেলনে এই প্রস্তাবনাগুলো কতটা গুরুত্ব পাবে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার লাখ লাখ গৃহহীন মানুষের ভাগ্য ফেরাতে তা কতটা কার্যকর হবে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। শান্তি কি কেবল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জীবনেও তার ছোঁয়া লাগবে—এই প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে পুরো বিশ্ব।