ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে সৃষ্ট উত্তেজনার মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইরানের হামলার পাল্টা জবাব দিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিয়ে একটি যৌথ সামরিক জোট গঠনের প্রস্তাব দিলেও, তা গ্রহণে অসম্মতি জানিয়েছে সৌদি আরব ও কাতার।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্য এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর। ২০২১ সালে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকেই দেশটি ইরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত ৪০ দিনের যুদ্ধে ইরান প্রায় তিন হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে আমিরাতের বিভিন্ন স্থাপনার ওপর। এমন পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে সৌদি আরব ও কাতারের মতো প্রভাবশালী প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করেন। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানো।
তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমিরাতের এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানসহ অন্যান্য উপসাগরীয় নেতারা। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের যে শীতলতা রয়েছে, তা এই সংকটের সময় আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। ‘অভিন্ন শত্রু’ ইরানের বিরুদ্ধেও তারা ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে আসতে ব্যর্থ হয়েছে, যা অঞ্চলের রাজনীতিতে গভীর ফাটলের ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত উভয়ই ইরানে পাল্টা হামলা চালিয়েছিল, কিন্তু তা ছিল পৃথক ও স্বতন্ত্র। সৌদি আরব যেখানে সামরিক ক্ষেত্রে সংযত আচরণ বজায় রেখেছে এবং প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পথ খুঁজতে চেয়েছিল, সেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে কঠোর আঘাত হেনেছে। এমনকি এপ্রিলের শুরুর দিকে আমিরাত ইরানের লাভান দ্বীপে বড় ধরনের হামলা চালায়, যার ফলে ওই স্থাপনার সক্ষমতা দীর্ঘ সময়ের জন্য অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই হামলা সেই সময়ে চলমান যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তোলে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই আগ্রাসী অবস্থানের পেছনে মূলত তাদের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কাজ করছে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় আমিরাতের তেল রপ্তানি ও অর্থনীতি মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে। সৌদি আরবের লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প পাইপলাইন থাকলেও আমিরাতের সেই সুযোগ নেই। এই অস্থিরতায় পর্যটন ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আমিরাতের দীর্ঘদিনের সুনামও ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ কারণে তারা জাতিসংঘে সামরিক হস্তক্ষেপের তদবির চালালেও তাতে সফল হয়নি।
অন্যদিকে, আরব আমিরাতের এই ইসরায়েল-ঘেঁষা অবস্থান ভালো চোখে দেখছে না সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ। ফিলিস্তিন ইস্যুকে কেন্দ্র করে পুরো আরব বিশ্ব যেখানে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং গাজায় চলমান যুদ্ধকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে, সেখানে আমিরাতের সঙ্গে ইসরায়েলের গভীর সামরিক ও প্রযুক্তিগত বিনিময় নতুন সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। খবর ছড়িয়েছে যে, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ইসরায়েল তাদের ‘আয়রন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত সেনা পাঠিয়ে আমিরাতকে সুরক্ষা দিয়েছিল। যদিও আবুধাবি বরাবরই তেল আবিবের সঙ্গে এই ‘গোপন মাখামাখি’ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে, তবে তাদের এই কৌশল এখন আঞ্চলিক রাজনীতিতে দেশটিকে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, কেবল কৌশলগত শত্রু থাকলেই দেশগুলো একজোট হয় না। বরং আদর্শিক অবস্থান এবং জাতীয় স্বার্থের ভিন্নতা অনেক সময় যৌথ নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ফিলিস্তিন ইস্যুর প্রতি সাধারণ আরব জনগণের যে সংবেদনশীলতা, তাকে উপেক্ষা করে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য এক নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই ফাটল যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ভবিষ্যতে কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা আরও দুরূহ হয়ে পড়বে।