দীর্ঘ এক দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রীয় সফরে চীন পৌঁছেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বেইজিংয়ের জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা, সামরিক কুচকাওয়াজ এবং বিশ্ববিখ্যাত একঝাঁক প্রযুক্তি উদ্যোক্তার উপস্থিতি এই সফরকে কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এক বিশাল অর্থনৈতিক গুরুত্বের আসনে বসিয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির দুই প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সম্পর্কের বরফ গলাতে এক ঐতিহাসিক সফরে এখন বেইজিংয়ে অবস্থান করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। প্রায় দশ বছর পর এই প্রথম কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান চীন সফরে এলেন, যা বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় যখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমান ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ (এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত বিশেষভাবে সুরক্ষিত উড়োজাহাজ) বেইজিং বিমানবন্দরের মাটি স্পর্শ করে, তখন থেকেই শুরু হয় এক আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন।
বিমানবন্দরের রানওয়েতে ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে বিছানো হয়েছিল রাজকীয় লাল গালিচা। তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেংসহ দেশটির শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। ট্রাম্পের এই সফরকে ঘিরে বেইজিং যেন এক উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। চীনের পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান এবং জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক ‘গার্ড অব অনার’ (সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া বিশেষ সম্মানসূচক সালাম)। সারিবদ্ধ চীনা সেনাসদস্যদের কুচকাওয়াজ ও অভিবাদন গ্রহণ করার সময় ট্রাম্পকে বেশ আত্মবিশ্বাসী ও হাস্যোজ্জ্বল দেখাচ্ছিল।
অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক ছিল শত শত চীনা শিশু-কিশোরের উপস্থিতি। তাদের হাতে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জাতীয় পতাকা। কোমলমতি শিশুদের কণ্ঠে মান্দারিন (চীনের প্রধান ভাষা) ভাষায় উচ্চারিত ‘স্বাগতম, আন্তরিক স্বাগতম’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো বিমানবন্দর এলাকা। লাল গালিচা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ট্রাম্প হাত নেড়ে শিশুদের অভিবাদনের উত্তর দেন। পরে নিজের বিশেষ বিলাসবহুল লিমোজিন গাড়িতে ওঠার আগে তিনি মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে নিজের চিরচেনা ভঙ্গিতে উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানান।
তবে ট্রাম্পের এই সফরের সবচেয়ে চমকপ্রদ ও আলোচিত দিক হলো তার বিশাল ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল। সচরাচর রাজনৈতিক সফরে এত বিপুল সংখ্যক ও প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের দেখা যায় না। ট্রাম্পের এই বেইজিং সফরে সঙ্গী হয়েছেন বিশ্বের বাঘা বাঘা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা। এই তালিকায় রয়েছেন আইফোনের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাপল’-এর প্রধান টিম কুক এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘টেসলা’ ও মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘স্পেসএক্স’-এর কর্ণধার ইলন মাস্ক। তাদের উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ট্রাম্পের এই সফরের মূল লক্ষ্য কেবল কূটনৈতিক আলোচনা নয়, বরং দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক লেনদেন ও প্রযুক্তি খাতের জটিলতা নিরসন করা।
ব্যবসায়ী এই প্রতিনিধিদলে আরও রয়েছেন বিশ্বের বৃহত্তম সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘ব্ল্যাকরক’-এর প্রধান ল্যারি ফিঙ্ক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘মেটা’-র (ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান) ভাইস চেয়ারম্যান ডিনা পাওয়েল ম্যাককর্মিক এবং আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘ভিসা’-র প্রধান নির্বাহী রায়ান ম্যাকলনার্নি। এছাড়া বিমান নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ‘বোয়িং’-এর প্রধান কেলি ওর্টবার্গ এবং বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘ব্ল্যাকস্টোন’-এর শীর্ষ কর্মকর্তা স্টিফেন শোয়ার্জম্যানসহ অন্তত এক ডজন মার্কিন করপোরেট মুঘল এই সফরে ট্রাম্পের ছায়াসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের সাথে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চীনের বিশাল বাজারে অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতেই ট্রাম্প এত বড় ব্যবসায়ী বহর নিয়ে বেইজিং এসেছেন। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর (ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের ক্ষুদ্র চিপ) নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে রেষারেষি চলছে, তার একটি সম্মানজনক সমাধান খোঁজাই এই সফরের অন্যতম নেপথ্য কারণ।
ডনাল্ড ট্রাম্পের এই চীন সফর কেবল দুটি দেশের সীমান্ত ও কূটনীতির বিষয় নয়, এটি বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। একদিকে চীনের বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা, অন্যদিকে আমেরিকার উন্নত প্রযুক্তি—এই দুইয়ের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষিত হয়, তা দেখতে মুখিয়ে আছে সারা বিশ্ব। বিশেষ করে ইলন মাস্ক বা টিম কুকের মতো ব্যক্তিদের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, ভবিষ্যৎ বিশ্ব অর্থনীতি রাজনীতি নয় বরং প্রযুক্তির হাত ধরেই পরিচালিত হবে। এই সফর কি দুই দেশের শত্রুতা কমিয়ে সহযোগিতার নতুন দুয়ার খুলে দেবে, নাকি এটি কেবলই সাময়িক এক সৌজন্য প্রদর্শন—সেই প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের এই ঘনিষ্ঠতা কি শেষ পর্যন্ত বিশ্ব শান্তির পথে সহায়ক হবে?