বৈশ্বিক রাজনীতি ও বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলী আকবর ভেলায়াতী এক কড়া সতর্কবার্তায় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি আর কোনো ‘ভুল’ পদক্ষেপ নেয়, তবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ চিরতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে আগুনের হলকা ছড়িয়ে দিয়েছে তেহরানের সাম্প্রতিক এই হুঁশিয়ারি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলী আকবর ভেলায়াতী গত রোববার এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে দেন। তার মতে, তথাকথিত ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ (রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট—মধ্যপ্রাচ্যের ইসরায়েল-বিরোধী জোটসমূহ) এখন থেকে বাব আল-মান্দেব প্রণালীকে হরমুজ প্রণালীর মতোই সমান কৌশলগত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে।
দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের প্রতিবাদে ইরান এই পথটি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। এর ফলে শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ সমুদ্রের মাঝে নোঙর করে অলস সময় পার করছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে নতুন করে বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধের আলোচনা শুরু হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভেলায়াতী তার বক্তব্যে হোয়াইট হাউসের নীতি নির্ধারকদের কড়া সমালোচনা করে বলেন, আমেরিকানরা হয়তো ইতিহাসের কিছু পাঠ নিয়েছে, কিন্তু তারা এখনো ‘ক্ষমতার ভূগোল’ (জিওপলিটিক্স—ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক প্রভাব) বুঝতে চরম ভুল করছে। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, ওয়াশিংটন যদি তাদের পূর্বের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি করে, তবে তারা অচিরেই দেখতে পাবে যে ইরান কেবল একটি মাত্র পদক্ষেপের মাধ্যমেই বিশ্বের জ্বালানি ও বাণিজ্যের চাকা স্থবির করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
এদিকে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই বাব আল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্যবাহী ও তেলের জাহাজ চলাচল করে। এটি বন্ধ হয়ে গেলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সরাসরি সমুদ্র বাণিজ্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এশীয় ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ইরানকে হুমকি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরান যদি অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী খুলে না দেয়, তবে তাদের ওপর ‘ভয়াবহ’ সামরিক হামলা চালানো হবে। এমনকি ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি সত্যিই ইরান ও তার মিত্ররা বাব আল-মান্দেব প্রণালী অবরুদ্ধ করতে সফল হয়, তবে তা আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। একদিকে হরমুজ প্রণালী বন্ধের কারণে তেলের দাম আকাশচুম্বী, অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব বন্ধ হলে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় যুদ্ধ মানে কেবল অস্ত্র বা বোমার লড়াই নয়, বরং অর্থনৈতিক করিডোর দখল বা রুদ্ধ করাও এক বড় হাতিয়ার। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ যেভাবে সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ করার দিকে এগোচ্ছে, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উন্নয়নশীল দেশগুলো। একটি ভুল পদক্ষেপ কি পুরো বিশ্বকে এক মহাপ্রলয়ংকারী অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ঠেলে দেবে? আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতা এখন সময়ের বড় দাবি।