বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর অস্বাভাবিক আচরণ এখন আর কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়, বরং প্রতিদিনের রূঢ় বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। কোথাও রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিতে ভাসছে জনপদ, কোথাও শক্তিশালী সামুদ্রিক ঝড় লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে উপকূল, আবার কোথাও ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহে প্রাণ হারাচ্ছেন শত শত মানুষ। বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং ইউরোপের দেশগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে এই চরম আবহাওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় জলবায়ু পরিস্থিতি ‘এল নিনো’ (একটি বিশেষ জলবায়ু চক্র)। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সতর্ক করেছে, আগামী মাসগুলোতে এল নিনোর এই ক্ষতিকর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।
পানির নিচে দেশের সাত জেলা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলা এখন বানের পানিতে ভাসছে। জেলাগুলো হলো—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। এসব জেলার অন্তত ৫৮টি উপজেলা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে দেশে এ পর্যন্ত ৪৪ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩৯ জন। বর্তমানে প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে, এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। গত ৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ভারী মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ফলে এই বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে সিলেট বিভাগের কিছু অংশেও ছড়িয়ে পড়ে।
ভারত ও পাকিস্তানে বিপর্যয়
একই মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও বন্যা ও ভূমিধস ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, কাশ্মীর ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ি ধসের ঘটনা ঘটেছে। হিমাচল ও উত্তরাখণ্ডে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, বন্ধ রাখা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কাশ্মীর ও মিজোরামে শত শত পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ভারী মৌসুমি বৃষ্টির আশঙ্কায় পাকিস্তানেও আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের সতর্কতা জারি করেছে দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
পূর্ব এশিয়ায় টাইফুন ‘বাভি’র তাণ্ডব
ফিলিপাইনে ১৭ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়ে শক্তিশালী টাইফুন ‘বাভি’ (সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়) সম্প্রতি আঘাত হেনেছে চীন, জাপান ও তাইওয়ানে। তাইওয়ানে ভূমিধসের আশঙ্কায় ১০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং বাতিল করা হয়েছে এক হাজারেরও বেশি বিমান ফ্লাইট (উড়োজাহাজ চলাচল)। জাপানের ওকিনাওয়ায় হাজার হাজার পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশে আঘাত হানার আগে সেখান থেকে প্রায় ১৭ লাখ বাসিন্দাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ইউরোপ কাঁপছে তীব্র তাপপ্রবাহে
এশিয়ার যখন এই দশা, তখন ইউরোপ পুড়ছে নজিরবিহীন খরায় ও দাবদাহে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন মাসটি ছিল পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ জুন। ‘হিট ডোম’ (উচ্চ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ বলয়) নামক আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতির কারণে ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানিতে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কেবল জার্মানিতেই অতিরিক্ত গরমে মারা গেছেন পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ।
ভবিষ্যৎ আরও আশঙ্কাজনক
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো সতর্ক করেছেন যে, এল নিনোর তীব্রতা নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে আগামী দিনগুলোতে সমুদ্রের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার আরও চরম অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ুর এই বিপর্যয় রুখতে এখন স্থানীয় দুর্যোগ মোকাবিলার পাশাপাশি বৈশ্বিক সমন্বিত পদক্ষেপ ও সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।