দীর্ঘ ১১০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক বা মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে সই করেছেন। চুক্তি প্রকাশ্যে আসার পরপরই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।
চুক্তির ১৪ দফার শর্ত অনুযায়ী, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক অভিযান ও শত্রুতা স্থায়ীভাবে বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দিতে সম্মত হয়েছে তেহরান। চুক্তির আওতায় ইরানের ওপর থেকে নৌ-অবরোধ ও তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে আটকে থাকা শত শত কোটি ডলারের ইরানি সম্পদ পর্যায়ক্রমে ছাড় দেওয়া হবে। বিনিময়ে ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সীমিত করবে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নজরদারি মেনে নেবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোর জন্য ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) ডলারের একটি বিশাল পুনর্গঠন তহবিল গঠনেরও প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিরসনে উভয় পক্ষ চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনায় বসবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) স্মারকের একটি অনুলিপি প্রকাশ করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি একে ‘ঐতিহাসিক দলিল’ আখ্যা দিয়ে বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমেই প্রকৃত শান্তি অর্জন সম্ভব। অন্যদিকে, ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলন শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরানের জব্দ করা অর্থ যুক্তরাষ্ট্রকে ফেরত দিতেই হবে, নইলে কেউ আর ডলারে বিনিয়োগ করবে না। তবে ইরান চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে সামরিক পদক্ষেপের কড়া হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই চুক্তিকে ব্যাপকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একে বৈশ্বিক শান্তির জন্য ‘বড় মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। চীন ও মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও এই কূটনৈতিক সাফল্যকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে।
চুক্তির তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। দীর্ঘ অচলাবস্থার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। একদিনেই পণ্যবাহী ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ট্যাংকারসহ অন্তত সাতটি জাহাজ এই নৌপথ অতিক্রম করেছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড (অপরিশোধিত তেল) ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ১২ শতাংশ কমে ৭৮ ডলার ৬৬ সেন্টে নেমে এসেছে।
তবে শান্তির এই আশাব্যঞ্জক উদ্যোগের মধ্যেই চরম শঙ্কার মেঘ তৈরি করেছে ইসরায়েলের অনড় অবস্থান। ঐতিহাসিক এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সব ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক সামরিক অভিযান বন্ধের কথা বলা হলেও, ইসরায়েল তা উপেক্ষা করে দক্ষিণ লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ইসরায়েলি ড্রোন (চালকবিহীন বিমান) হামলায় এক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন সাইক্লিস্টসহ অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। লেবাননের ভেতরে প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে ইসরায়েলি সেনাদের বর্তমান অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা হতে পারে বলে সতর্ক করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।