আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআর কঙ্গো) উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবিরে (আশ্রয়কেন্দ্র) হঠাৎ করেই মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছে। মে মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অবুঝ শিশুসহ অন্তত ৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। উপসর্গ দেখে চিকিৎসকদের জোরালো সন্দেহ, সেখানে প্রাণঘাতী ‘ইবোলা’ ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তবে আতঙ্ক আর কুসংস্কারের কারণে রোগীরা নমুনা পরীক্ষা করতে না দেওয়ায় বিষয়টি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ চিত্র। জানা যায়, ইবোলা প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল বুনিয়া শহরের কিগোঞ্জে শিবিরে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। প্রায় ১৫ হাজার মানুষের বসবাস এই শিবিরে। মৃতদের প্রায় সবার মধ্যেই তীব্র মাথাব্যথা, প্রচণ্ড জ্বর ও বমির মতো উপসর্গ দেখা গেছে, যা মূলত ইবোলা ভাইরাসেরই অন্যতম প্রধান লক্ষণ।
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা উঠে এসেছে শিবিরের সভাপতি ডিজ'জো এতিয়েনের কথায়। তিনি জানান, এর আগে কখনো এভাবে মানুষের মৃত্যু হতে দেখা যায়নি। আগে যেখানে মাসে গড়ে এক থেকে তিনজন মারা যেত, সেখানে চরম আতঙ্কের বিষয় হলো—শুধু চলতি সপ্তাহেই ১০ জনকে দাফন করা হয়েছে।
ক্যাথলিক আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা ‘ক্যারিটাস’-এর পরিচালক জাস্টিন জানামুজি জানান, তার একটি দল বুধবার (১৭ জুন) ওই শিবির পরিদর্শনে যায়। সেখানে তারা চাদরে মোড়ানো একাধিক মরদেহ দেখতে পান, যার মধ্যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে গর্ভবতী নারী ও শিশুও ছিল। স্বাস্থ্যকর্মীরা বিশেষ সুরক্ষা পোশাক (পিপিই) পরে জীবাণুনাশক ছিটিয়ে ছোট ছোট কফিন প্রস্তুত করছিলেন। তবে চিকিৎসকরা মৃত বা জীবিত কারও দেহ থেকেই নমুনা সংগ্রহের অনুমতি পাননি। স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনরা পরীক্ষা করাতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
শিবিরের এক হতভাগ্য বাবা কাতো লোনু তার দুটি সন্তানকে হারিয়েছেন। এর মধ্যে এক শিশুর বয়স ছিল মাত্র ছয় মাস। স্বজন হারানোর চরম ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে তিনি বলেন, চারদিকে তাকালেই শুধু মানুষের মৃত্যু দেখছি। চোখের সামনে একের পর এক মানুষ মারা যাচ্ছে, এভাবে বেঁচে থাকা কোনো মানুষের জন্যই মেনে নেওয়ার মতো নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কলেরার উপসর্গও অনেক সময় ইবোলার মতো হতে পারে। তবে কলেরার চেয়ে ইবোলার সংক্রমণ অনেক বেশি ভয়ংকর। ডিআর কঙ্গো সরকার গত ১৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে ইবোলা প্রাদুর্ভাবের ঘোষণা দিলেও, মৃত্যুর ঘটনা শুরু হয়েছিল তার আগে থেকেই। পূর্ব কঙ্গোয় বর্তমানে ৫০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ রয়েছেন। কিগোঞ্জে শিবিরের এই অচলাবস্থা ও স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতা গোটা অঞ্চলের জন্যই বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে।
মানবাধিকার ও ত্রাণকর্মীরা এই বিপর্যয়ের পেছনে আন্তর্জাতিক সহায়তার অভাবকেই দুষছেন। জাতিসংঘের তথ্যমতে, কঙ্গোর এই শিবিরগুলোতে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা (স্যানিটেশন) ও বিশুদ্ধ পানির জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন অর্ধেকেরও বেশি কমে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারে নেমেছে। চলতি বছরের জন্য ৮ কোটি ডলার তহবিলের আহ্বান জানানো হলেও, এখন পর্যন্ত মিলেছে মাত্র ২১ শতাংশ। ফলে চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে গিয়ে চিকিৎসার অভাবে অজানা মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছেন অসহায় সাধারণ মানুষ।