দীর্ঘদিনের নেতিবাচক তকমা ঝেড়ে ফেলে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে পাকিস্তান। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির অভাবনীয় সাফল্য এখন বিশ্ববাসীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে গত মাস পর্যন্ত যেখানে চরম অবিশ্বাস ও সমালোচনা ছিল, তা এখন বিস্ময়করভাবে ইতিবাচকতায় রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক জনমত জরিপ সংস্থা ইপসোসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চমকপ্রদ তথ্য। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসের শেষ দিকেও বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন। তবে গত ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের জোরালো ভূমিকা দৃশ্যমান হওয়ার পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে বিশ্বের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ পাকিস্তানের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করছেন।
এর আগে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ জনমতসহ যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের নাগরিক মহলে দেশটির রণকৌশল এবং সরকারের বৈধতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ছিল। খোদ পাকিস্তানি নাগরিকরাই সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত ছিলেন। তবে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সমন্বিত কূটনৈতিক তৎপরতা সেই চিত্র বদলে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন ‘ধন্যবাদ পাকিস্তান’ (থ্যাংক ইউ পাকিস্তান) স্লোগানটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাধারণ নাগরিকরাও নিজ দেশের সরকারের ভূমিকার চেয়ে পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক উদ্যোগের অধিক প্রশংসা করছেন।
এই মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আজ শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার (সংসদীয় প্রধান) মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির নেতৃত্বে আসা প্রতিনিধিদলকে প্রধানমন্ত্রী শরিফ শান্তি প্রক্রিয়ায় সক্রিয় হওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় পাকিস্তান তার আন্তরিক মধ্যস্থতা অব্যাহত রাখবে।
একই দিন প্রধানমন্ত্রী শরিফ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সারেন। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি উপস্থিত ছিলেন। মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান শান্তি আলোচনাকে একটি সফল পরিণতির দিকে নিয়ে যেতেই পাকিস্তানের এই নিরলস দৌড়ঝাঁপ।
একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি কতটা শক্তিশালী হতে পারে, পাকিস্তান তার সাম্প্রতিক উদাহরণ। যুদ্ধের দামামা থামিয়ে শান্তির পথ প্রশস্ত করার এই উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে পাকিস্তানের গুরুত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই ইতিবাচক ভাবমূর্তি ধরে রাখা এবং একটি স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করাই এখন দেশটির আসল চ্যালেঞ্জ।