তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা জোসেফ বিজয় ওরফে ‘থালাপতি’ বিজয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় কড়া হুঁশিয়ারির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে রাজ্যজুড়ে ৭০০-এর বেশি মদের দোকান বন্ধের ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
ভারতের দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় মহাতারকা এবং বর্তমানে তামিলনাড়ুর নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী জোসেফ বিজয় তার রাজনৈতিক ইনিংস শুরু করেছেন অত্যন্ত সাহসী কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে। গত মঙ্গলবার সকালে এক বিশেষ বার্তায় তিনি রাজ্যের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে নিজের অনড় অবস্থানের কথা জানান। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি এক নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। বিজয় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, তার শাসনামলে যদি কোনো হিন্দু নাগরিক কোনো মুসলিমের ওপর অন্যায় বা অত্যাচার চালায়, তবে প্রশাসন এমন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে যা বিশ্বের ইতিহাসে একটি বড় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
মুখ্যমন্ত্রীর এই কড়া বার্তার মূল উদ্দেশ্য হলো রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখা। তিনি মনে করেন, অপরাধীর কোনো ধর্ম নেই এবং আইন সবার জন্য সমান। নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করাকে তিনি সরকারের প্রধান পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, কোনো ধরণের ধর্মীয় উসকানি বা বিবাদ সহ্য করা হবে না এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।
ক্ষমতা গ্রহণের পর বিজয় তার প্রথম বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে রাজ্যজুড়ে মদের দোকানের সংখ্যা কমানোর নির্দেশ জারি করেছেন। জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি তামিলনাড়ু রাজ্য বিপণন সংস্থা (টাসম্যাক) পরিচালিত মোট ৭১৭টি মদের দোকান অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। এই দোকানগুলো মূলত বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেমন মন্দির, মসজিদ, গির্জা কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জনবহুল বাস স্ট্যান্ডের খুব কাছাকাছি অবস্থিত ছিল। জনস্বাস্থ্যের ওপর মদের নেতিবাচক প্রভাব এবং সামাজিক অবক্ষয় রোধেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে তামিলনাড়ু রাজ্যে মোট ৪ হাজার ৭৬৫টি সরকার অনুমোদিত মদের দোকান রয়েছে। নতুন নিয়মে কোনো ধর্মীয় স্থান, বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় বা বাস স্ট্যান্ডের ৫০ মিটারের মধ্যে কোনো মদের দোকান থাকতে পারবে না। বন্ধ হতে যাওয়া দোকানগুলোর মধ্যে ২৭৬টি ধর্মীয় উপাসনালয়ের কাছে এবং ১৮৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সীমানার মধ্যে অবস্থিত ছিল। এছাড়া ২৫৫টি দোকান বিভিন্ন জনবহুল বাস স্টপেজের আশপাশে থাকায় সেগুলোও সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ৫১ বছর বয়সী এই নেতার রাজনৈতিক দল ‘তামিলনাড়ু ভেট্টি কাজাগাম’ (টিভিকে) এবারের নির্বাচনে রাজ্যে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে—এই দুটি বড় দলের যে আধিপত্য ছিল, তা এককভাবে ভেঙে দিয়েছেন বিজয়। কংগ্রেস, বামপন্থী দলসমূহ এবং মুসলিম লিগের মতো দলগুলোর সমর্থন নিয়ে তিনি রাজ্যের ইতিহাসে প্রথম একটি সফল জোট সরকার গঠন করেছেন। এই বিজয় কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাজ্যের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জনকল্যাণে আরও বেশ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়। তিনি ঘোষণা করেছেন যে, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রতি মাসে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হবে। এছাড়া নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ বাহিনী গঠন এবং প্রতিটি জেলায় মাদক বিরোধী বিশেষ শাখা (ইউনিট) তৈরির পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছেন তিনি।
তবে মদের দোকান বন্ধের মতো সাহসী সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্য সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয়ে বড় ধরণের টান পড়তে পারে বলে অনেক অর্থনীতিবিদ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সরকারের এই আয় কমে গেলে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ বা অন্যান্য সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পের অর্থায়নে সমস্যা হতে পারে। তবে বিজয় এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পূর্ববর্তী সরকারের আমলের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে একটি শ্বেতপত্র (সরকারের দেওয়া বিশেষ তথ্য সম্বলিত প্রতিবেদন) প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন। এই শ্বেতপত্রের মাধ্যমে তিনি রাজ্যের আর্থিক স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরবেন।
থালাপতি বিজয়ের এই প্রারম্ভিক পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে তিনি কেবল জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে নন, বরং একজন জনদরদী নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে তার কঠোর অবস্থান যেমন প্রশংসিত হচ্ছে, তেমনি মদের দোকান বন্ধ করে রাজস্ব আয়ের মোহ ত্যাগ করা একটি অত্যন্ত বড় নৈতিক সিদ্ধান্ত। তবে রাজনীতির জটিল ময়দানে এই আদর্শিক অবস্থান তিনি কতদিন ধরে রাখতে পারবেন এবং রাজস্ব ঘাটতি কীভাবে পূরণ করবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে বিজয়ের এই উত্থান কি ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও কোনো বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে? পাঠক হিসেবে আপনি বিষয়টি নিয়ে কী ভাবছেন?