ভবিষ্যতের পৃথিবী শাসন করবে প্রযুক্তি। আর সেই প্রযুক্তির দৌড়ে নিজেদের শীর্ষস্থান ধরে রাখতে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী এক পরিবর্তন এনেছে চীন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই) এবং উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ১২ হাজারেরও বেশি কলা, মানবিক ও ভাষাবিষয়ক স্নাতক ডিগ্রি চিরতরে বাতিল করা হয়েছে। বিপরীতে, ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের বিপুল চাহিদা পূরণে চালু করা হয়েছে ১০ হাজারের বেশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নতুন কোর্স।
চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ১২ হাজার ২০০টি প্রচলিত স্নাতক প্রোগ্রাম বাতিল বা স্থগিত করেছে। ঠিক একই সময়ে ১০ হাজার ২০০টি নতুন ডিগ্রি কর্মসূচি যুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষাক্রমের এই ব্যাপক রদবদলের ফলে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণ নতুন রূপ পেয়েছে, যা লাখ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও হংকং-ভিত্তিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে প্রচলিত অনেক কলা, মানবিক ও ভাষাবিষয়ক ডিগ্রি এখন ‘অচল’ এবং চাহিদাহীন বলে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, ‘এমবডিড ইন্টেলিজেন্স’ (মূর্ত বুদ্ধিমত্তা), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডাটা (মহাতথ্য), রোবোটিক্স, সেমিকন্ডাক্টর এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোকে বেইজিংয়ের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশলের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদদের মতে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং চাকরির বাজারের সঙ্গে দক্ষতার বিস্তর ফারাক চীনের জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করলেও আধুনিক প্রযুক্তির জ্ঞান না থাকায় তারা কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাচ্ছিলেন না। এই রূঢ় বাস্তবতা থেকেই শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর এমন সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে শি জিনপিংয়ের সরকার।
সাংহাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে জানান, কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকার কারণেই তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু প্রচলিত ডিগ্রি বন্ধ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভাবনীয় বিকাশের ফলে প্রোডাক্ট ডিজাইন (পণ্য নকশা)-এর মতো খাতেও বড় প্রভাব পড়েছে। থ্রিডি মডেল তৈরি কিংবা ভিজ্যুয়ালাইজেশনের (দৃশ্যায়ন) মতো সময়সাপেক্ষ কাজগুলো এখন অনায়াসেই এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে নিমিষে করা সম্ভব হচ্ছে।
শুধু চীনই নয়, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের কথা ভেবে বিশ্বের অন্যান্য দেশও নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে সাজাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত ইতোমধ্যে তাদের জাতীয় শিক্ষাক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত চালু করেছে ‘জাতীয় এআই শিক্ষা উদ্যোগ’। কাজাখস্তান ও স্পেনের মতো দেশগুলোও ডিজিটাল শিক্ষার প্রসারে কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে। এছাড়া, যুক্তরাজ্য তথ্যবিজ্ঞান ও এআই-ভিত্তিক নতুন শিক্ষাগত যোগ্যতা চালুর বিষয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে চীনের এই আমূল পরিবর্তন আগামী দিনে বিশ্বের অন্যান্য দেশের উচ্চশিক্ষা সংস্কারেও গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।