ইরানের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বলপূর্বক খুলে দেওয়ার মার্কিন পরিকল্পনায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে। বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে রাশিয়া ও চীন এই প্রস্তাবের বিপক্ষে তাদের সংরক্ষিত ক্ষমতা বা ভেটো (প্রস্তাব নাকচ করার বিশেষ অধিকার) প্রয়োগ করায় প্রস্তাবটি ভেস্তে গেছে।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক সময় অনুযায়ী রাতে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে এক উত্তেজনাকর অধিবেশনে এই ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে আয়োজিত এই অধিবেশনে প্রস্তাবের পক্ষে ১১টি দেশ ভোট প্রদান করে। তবে নিরাপত্তা পরিষদের দুই স্থায়ী সদস্য দেশ রাশিয়া ও চীন সরাসরি বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় প্রস্তাবটি আর আলোর মুখ দেখেনি। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তান এই ভোটদান প্রক্রিয়া থেকে বিরত ছিল।
মূলত পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বলপ্রয়োগ বা সামরিক শক্তির মাধ্যমে খুলে দেওয়ার বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছিল মস্কো ও বেইজিং। চীনের প্রবল বিরোধিতার মুখে মূল খসড়া প্রস্তাব থেকে ‘সামরিক শক্তি ব্যবহারের’ অংশটি বাদ দিয়ে একটি সংশোধিত প্রস্তাব ভোটাভুটির জন্য পেশ করা হয়েছিল। পশ্চিমা বিশ্বের আশা ছিল যে, সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি বাদ দিলে হয়তো রাশিয়া ও চীন এতে বাধা দেবে না। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশ দুটি শেষ পর্যন্ত তাদের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রস্তাবটি বাতিল করে দেয়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির উত্তেজনা আরও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা যখন হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে মরিয়া, তখন রাশিয়া ও চীনের এই অবস্থান ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এদিকে, ভেটো প্রদানের মাধ্যমে ইরান কার্যত একটি বড় ধরনের আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচ পেল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তের পর মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় এখন বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর আল্টিমেটাম (চূড়ান্ত সময়সীমা), অন্যদিকে নিরাপত্তা পরিষদের এই অচলাবস্থা—সব মিলিয়ে পুরো বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। এই প্রস্তাব গৃহীত হলেও বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় তা কতটুকু বাস্তবসম্মত প্রভাব ফেলত, তা নিয়ে খোদ নিরাপত্তা পরিষদের অনেক সদস্য দেশের মধ্যেই সংশয় ছিল।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার ও চীনের এই ভেটো প্রয়োগ কেবল একটি প্রস্তাব বাতিল নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্যের এক নতুন রূপ ফুটিয়ে তুলেছে। এটি স্পষ্ট যে, একক সিদ্ধান্তে বিশ্ব শাসন করার দিনগুলো এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে কূটনৈতিক এই টানাপোড়েন যদি শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে না ফিরে সামরিক সংঘাতের দিকে মোড় নেয়, তবে তার দায়ভার পুরো বিশ্বকেই নিতে হবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা যেমন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য হুমকি, তেমনি একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ হবে মানবসভ্যতার জন্য চরম বিপর্যয়।