ভারতীয় সংগীত জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র আশা ভোঁসলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ৯২ বছর বয়সী এই সুরসম্রাজ্ঞীর শারীরিক অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে।
সুরের জাদুতে কোটি শ্রোতার হৃদয় জয় করা কালজয়ী কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলে এখন হাসপাতালের শয্যায় জীবন-মৃত্যুর লড়াই চালাচ্ছেন। শনিবার শ্বাসকষ্ট এবং হৃদযন্ত্রের (হার্ট) জনিত জটিলতা দেখা দিলে তাকে দ্রুত মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে নেওয়া হয়। বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই ভুগছিলেন, তবে গতকাল থেকে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, প্রবীণ এই শিল্পীর ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে তাকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে বা আইসিইউ-তে (যেখানে মুমূর্ষু রোগীদের বিশেষ ব্যবস্থায় রাখা হয়) স্থানান্তর করা হয়েছে। সেখানে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি বিশেষ দল সার্বক্ষণিক তাকে পর্যবেক্ষণে রাখছেন। তবে এখনো তার পরিবারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য প্রদান করা হয়নি।
আশা ভোঁসলে মানেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের আট দশকের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৪৩ সালে ক্যারিয়ার শুরু করা এই শিল্পী হিন্দি ছাড়াও বাংলাসহ ভারতের প্রায় সব কটি প্রধান ভাষায় কয়েক হাজার গান গেয়েছেন। লতা মঙ্গেশকরের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। গায়কীর বৈচিত্র্য আর সুরের বিচিত্র সব খেলায় তিনি জয় করেছেন আবালবৃদ্ধবনিতার মন।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে তাকে ভারত সরকারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’-এ ভূষিত করা হয়। এছাড়া চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারসহ দেশি-বিদেশি অসংখ্য পুরস্কার রয়েছে তার ঝুলিতে। ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’, ‘ইন আঁখোঁ কি মস্তি কে’ কিংবা ‘ইয়ে ক্যায়া জাগাহ হ্যায় দোস্তোঁ’-এর মতো কালজয়ী গজল ও গানগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তার অসুস্থতার খবরে ভারতসহ সারা বিশ্বের সংগীত অনুরাগী ও ভক্তদের মাঝে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সবাই প্রিয় শিল্পীর দ্রুত আরোগ্য কামনায় প্রার্থনা করছেন।
সংগীতের ইতিহাসে আশা ভোঁসলে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের গায়িকা নন, বরং তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। বার্ধক্যের কাছে প্রকৃতির নিয়মেই মানুষ হার মানে, কিন্তু তার সৃষ্টি আমাদের সংস্কৃতিকে যা দিয়েছে তা অতুলনীয়। এই কঠিন সময়ে আমাদের প্রার্থনা তার কণ্ঠ যেন আবারও সুস্থ হয়ে ফিরে আসে। তার এই সংকটকাল আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, গুণের কদর আর কিংবদন্তিদের যথাযথ সম্মান প্রদানই একটি জাতির সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির পরিচয়।