যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক বিমান হামলার পাল্টা অত্যন্ত কঠোর জবাব দিতে শুরু করেছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যের তিন প্রতিবেশী রাষ্ট্র কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে একযোগে চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা মিসাইল হামলা চালিয়েছে তেহরান। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এক যৌথ বিবৃতিতে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে এই সমন্বিত হামলা চালানোর সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। হামলার পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও আশপাশের বেসামরিক এলাকাগুলোতে যুদ্ধকালীন সতর্কসংকেত বা সাইরেন বাজিয়ে লোকজনকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইরানের সামরিক সুত্রগুলো জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনীর লজিস্টিক হাব বা যোগাযোগ ও সামরিক রসদ সরবরাহ কেন্দ্র, প্রধান গোলাবারুদের ডিপো এবং সামরিক বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করেই এই নিখুঁত হামলা চালানো হয়েছে। তেহরানের দাবি, মার্কিন আগ্রাসন রুখতেই তাদের এই প্রতিরোধমূলক আক্রমণ।
এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই ওয়াশিংটনের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম (মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন সামরিক সদর দপ্তর) জানিয়েছিল, তারা টানা সপ্তম রাতের মতো ইরানের অভ্যন্তরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের দাবি, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করে ইরানের সামরিক নজরদারি কেন্দ্র, প্রধান ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার এবং সামুদ্রিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর তীব্র হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন বিমান হামলায় দেশটির হরমোজগান, বুশেহর, লার, জাস্ক, সিরিক, বন্দর আব্বাস, ক্বেশম দ্বীপ এবং ইয়াজদসহ বেশ কয়েকটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক ও সামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তেহরান প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে, কেবল হরমোজগান প্রদেশেই মার্কিন হামলায় অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনপন্থী ইরানি নাগরিক নিহত এবং আরও আটজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
এই পাল্টাপাল্টি রক্তক্ষয়ী হামলার জেরে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত জলপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস) দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক এই জলসীমায় সন্দেহজনক মাইনের বিস্ফোরণে দুটি তেলবাহী আন্তর্জাতিক ট্যাংকার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে মার্কিন সেন্টকম ইরানের এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার এই প্রত্যক্ষ সংঘাত সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে এক চরম বিপর্যয় ও যুদ্ধাবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের স্থবিরতা নিয়ে আসবে।