রুপোলি পর্দা থেকে সোজা রাজনীতির রাজপথে এক অভাবনীয় উত্থান। সব জল্পনা ও কয়েক দিনের রাজনৈতিক নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক যুগের সূচনা করলেন জনপ্রিয় অভিনেতা থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয়। রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী দুই দলের ষাট বছরের একচেটিয়া আধিপত্য গুঁড়িয়ে দিয়ে নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তিনি।
ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর রাজনীতি বরাবরই চলচ্চিত্র তারকাদের জন্য এক উর্বর ভূমি। তবে এবার যা ঘটল, তা যেন আগের সব ইতিহাসকেও হার মানিয়েছে। রোববার চেন্নাইয়ের জওহরলাল নেহেরু ক্রীড়া প্রাঙ্গণে এক বর্ণাঢ্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন একান্ন বছর বয়সি জনপ্রিয় তারকা 'থালাপতি' (সেনাপতি) বিজয়। তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথবাক্য পাঠ করান রাজ্যের রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথন আরলেকার। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিদের মধ্যে ভারতের লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর উপস্থিতিও ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
সম্প্রতি সমাপ্ত হওয়া তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ের নবগঠিত দল 'তামিলাগা ভেত্রি কাজাগম' (টিভিকে) যে ফলাফল করেছে, তা গোটা ভারতের রাজনৈতিক মহলে রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেছে। রাজ্যের মোট ২৩৪টি আসনের মধ্যে বিজয়ের দল একাই জয়লাভ করেছে ১০৮টি আসনে। প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই এমন বিপুল জনসমর্থন পাওয়া রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও অবাক করেছে। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ১১৮টি আসনের (যাকে জাদুর সংখ্যা বলা হয়) চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকায় এককভাবে সরকার গঠন করতে পারেননি বিজয়।
নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে চরম নাটকীয়তা শুরু হয়। প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করতে বিজয়কে কয়েক দিন ধরে দফায় দফায় রাজ্যপালের সঙ্গে বৈঠক করতে হয়। চূড়ান্তভাবে সরকার গঠনের জন্য তিনি ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এবং বামপন্থি দলগুলোর দ্বারস্থ হন। দীর্ঘ আলোচনার পর কংগ্রেসের পাঁচজন, ভিদুথালাই চিরুথাইগাল কাচচি’র (ভিসিকে) দুজন, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) দুজন, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি-মার্কসবাদীর (সিপিআইএম) দুজন এবং ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের (আইইউএমএল) দুজন বিধায়কের নিঃশর্ত সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হন তিনি। এই জোটবদ্ধ শক্তির সমর্থন রাজ্যপালের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করার পরই সরকার গঠনের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত পান এই তারকা নেতা।
এই নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে গত প্রায় ছয় দশকের একটি পুরোনো প্রথার অবসান ঘটল। গত ষাট বছর ধরে রাজ্যটির ক্ষমতা কেবল দুটি দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল—দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাগম (ডিএমকে) এবং অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাগম (এআইএডিএমকে)। এবার এই দুই দলের রথ থামিয়ে দিয়েছেন বিজয়। এবারের নির্বাচনে বিদায়ী ক্ষমতাসীন দল ডিএমকে মাত্র ৫৯টি আসন এবং বিরোধী দল এআইএডিএমকে মাত্র ৪৭টি আসন পেয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
রোববার বিজয়ের পাশাপাশি তার মন্ত্রিসভার আরও নয়জন সদস্যও গুরুত্বপূর্ণ পদে শপথ নিয়েছেন। এই নয়জনই বিজয়ের দল টিভিকে-এর নির্বাচিত সদস্য। তবে এই মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক কেএ সেনগোতাইয়ান। তিনি একসময় এআইএডিএমকে-এর প্রথম সারির নেতা ছিলেন এবং দলটির কিংবদন্তি নেতা এমজি রামচন্দ্রন ও জয়ললিতার মতো রাজনৈতিক মহীরুহদের সঙ্গে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। দলটির বর্তমান নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে তাকে বহিষ্কার করা হলে বিজয় তাকে সসম্মানে নিজের দলে টেনে নেন এবং মন্ত্রিসভায় স্থান দেন।
প্রাথমিক এই মন্ত্রিসভায় আরও জায়গা পেয়েছেন আধাভ অর্জুনা, নির্মল কুমার, দলের সাধারণ সম্পাদক এন আনন্দ, রাজ মোহন, চিকিৎসক টিকে প্রভু, অরুন রাজ, পি ভেঙ্কটারমন এবং এস কীর্তনা। তবে কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে, আগামী দিনে সমর্থনকারী জোট শরিকদের মধ্য থেকেও কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করা হতে পারে। তবে বর্তমানে বিজয়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগামী বুধবারের মধ্যে রাজ্য বিধানসভায় নিজের সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দেওয়া।
সিনেমার পর্দায় অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা এক প্রতিবাদী নায়ককে বাস্তবের শাসক হিসেবে মেনে নিয়েছে তামিলনাড়ুর সাধারণ মানুষ। ঐতিহ্যবাহী দুই দলের দুর্নীতি ও একঘেয়েমিতে ক্লান্ত ভোটাররা বিজয়ের ওপর যে অন্ধ বিশ্বাস স্থাপন করেছেন, তা নিঃসন্দেহে এক বিশাল রাজনৈতিক পালাবদল। তবে সিনেমার চিত্রনাট্য আর বাস্তবের প্রশাসন চালানো এক বিষয় নয়। একটি বহুদলীয় জোট সরকার টিকিয়ে রাখা এবং সাধারণ মানুষের পাহাড়সম প্রত্যাশা পূরণ করা এই নবীন রাজনীতিবিদের জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। থালাপতি বিজয় কি পারবেন রূপালি পর্দার মতোই বাস্তব জীবনের রাজনৈতিক ময়দানেও সফলতার স্বাক্ষর রাখতে? এর উত্তর সময়ই বলে দেবে।