ভারতে মেডিকেল পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে এবং বেকারত্ব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা নতুন ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’র (সিজেপি) ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতাসীন মোদী সরকারের আপত্তির মুখে এই দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা দাবি করেছেন, যা দেশটির তরুণ সমাজের মধ্যে তীব্র আলোড়ন তৈরি করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে গত শনিবার (২৩ মে) অভিযোগ করেন যে, সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপে তাদের মূল ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে, গত বৃহস্পতিবার ভারত সরকারের বিশেষ অনুরোধে খুদে ব্লগিং সাইট ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) কর্তৃপক্ষ দেশটিতে তেলাপোকা জনতা পার্টির দাপ্তরিক অ্যাকাউন্টটি অবরুদ্ধ বা বন্ধ করে দেয়। শুধু তাই নয়, অভিজিৎ দিপকের ব্যক্তিগত ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি বারবার হ্যাক করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ভারত সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার (নীট পরীক্ষা) প্রশ্নফাঁসের গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ চলছে। এই অস্থিরতার মাঝেই মাত্র এক সপ্তাহ আগে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী উপায়ে সামাজিক মাধ্যমে এই ‘তেলাপোকা আন্দোলন’ শুরু হয়। অত্যন্ত কম সময়ে এটি ভারতের নতুন প্রজন্মের তরুণদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং সরকারের কঠোর সমালোচনা করে মূলধারার আলোচনায় উঠে আসে।
এই অদ্ভুত নামের আন্দোলনের পেছনে রয়েছে এক অভিনব প্রতিবাদী ইতিহাস। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি শুনানির সময় মন্তব্য করেছিলেন যে, বেকার তরুণদের একাংশ তেলাপোকার মতো আচরণ করছে—এমন একটি খবর গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও পরবর্তীতে বিচারপতি সূর্য কান্ত বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে দাবি করেন, তাঁর মন্তব্যটি সাধারণ তরুণদের উদ্দেশ্যে ছিল না, বরং যারা ভুয়া সনদ বা ডিগ্রিধারী, তাদের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি এই শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। তবে প্রধান বিচারপতির ওই মন্তব্যে চরম অপমানিত বোধ করে বেকার তরুণ সমাজ। এর প্রতিবাদে ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের সাথে ব্যঙ্গাত্মক মিল রেখে অভিজিৎ দিপকে প্রতিষ্ঠা করেন ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ (সিজেপি)।
সামাজিক মাধ্যমে তেলাপোকা জনতা পার্টির জনপ্রিয়তা কত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, তার প্রমাণ মেলে অনুসারীদের সংখ্যায়। আন্দোলনের মূল ইনস্টাগ্রাম পাতায় মাত্র এক সপ্তাহে অনুসারীর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ২ কোটি ২০ লাখের ঘর। অপরদিকে, ভারতের দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারী সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৯০ লাখের কাছাকাছি। প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের দাবি অনুযায়ী, গত সাত দিনে প্রায় ১০ লাখের বেশি বেকার তরুণ এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার জন্য সরাসরি নিবন্ধন করেছেন। একই সময়ে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তাদের অনলাইন আবেদনে প্রায় ছয় লাখ মানুষ স্বাক্ষর করেছেন।বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ডিজিটাল মাধ্যমে এই আন্দোলনের অভাবনীয় জোয়ার ও তরুণদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখে ভারতের নীতি নির্ধারকেরা এক ধরনের অস্বস্তিতে পড়েছেন। আর সেই কারণেই ওয়েবসাইট বন্ধ ও সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তরুণরা দমে না গিয়ে ইন্টারনেটের বিভিন্ন বিকল্প মাধ্যমে তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে।
ভারতে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’র মতো একটি ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের এই বিপুল জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে, প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর তরুণ প্রজন্মের আস্থা কতটা হ্রাস পেয়েছে। রসাত্মক ও রূপক প্রতিবাদের আড়ালে মূলত বেকারত্ব, প্রশ্নফাঁস এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি তরুণদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করার জন্য ওয়েবসাইট বা সামাজিক মাধ্যমের পথ বন্ধ করে দেওয়া সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু তরুণদের মনের ক্ষোভকে এভাবে চিরতরে চেপে রাখা যায় না। ইন্টারনেট সেন্সরশিপের এই নীতি শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দেয় কিনা, সেটিই এখন দেখার বিষয়।