দেশের উত্তর জনপদের অন্যতম জীবনরেখা তিস্তা নদীর টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত আপত্তি উপেক্ষা করে এই বৃহৎ অভ্যন্তরীণ প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে চূড়ান্ত রূপ দিতে যাচ্ছে ঢাকা। বাংলাদেশের এই স্বাধীন অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক তৎপরতা নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারক ও কৌশলগত মহলে গভীর উদ্বেগ ও অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্বীকার করেছেন যে, তিস্তা নদী সংক্রান্ত যেকোনো বড় পরিবর্তন এবং প্রকল্পের অগ্রগতিকে ভারত বিশেষ নজরে রাখছে। তিনি জানান, তিস্তা প্রকল্পের নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ে ভারতের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান ইতিপূর্বেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকাকে জানানো হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের উদ্বেগের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমত, তিস্তা নদীটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সমান্তরালে প্রবাহিত। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের অবস্থান সীমান্ত থেকে মাত্র ১০-২০ কিলোমিটার দূরে, যা ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘শিলিগুড়ি করিডর’ (শিলিগুড়ি সংযোগপথ) বা ‘চিকেনস নেক’ (মুরগির ঘাড়সদৃশ অত্যন্ত সংকীর্ণ পথ) এর অত্যন্ত কাছে। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আটটি রাজ্যের যোগাযোগের একমাত্র সংকীর্ণ পথটির কাছে চীনা প্রকৌশলী ও প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি ভারতের জন্য বড় সামরিক নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই প্রকল্পে যুক্ত মূল চীনা প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ারচায়না’ (চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ ও প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান) চীনের কমুনিস্ট পার্টি ও পিএলএ (পিপলস লিবারেশন আর্মি বা চীনের গণমুক্তি ফৌজ) এর কৌশলগত কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বাংলাদেশ মোংলা বন্দরের কাছে পূর্বে ভারতের জন্য নির্ধারিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের চুক্তি বাতিল করে সম্প্রতি চীনা রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে কাজ দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেইজিং ও ঢাকার মধ্যে ‘২+২ সংলাপ’ (কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সংলাপ) এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যার অধীনে জেএফ-১৭ ব্লক ৩ এর সিমুলেটর (অনুকরণ যন্ত্র) ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে পৌঁছেছে।
তবে সব ধরনের কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে জাতীয় স্বার্থে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনড় অবস্থান ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মানুষের দীর্ঘদিনের পানিসংকট নিরসনে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা দেশের একটি ‘জাতীয় অগ্রাধিকার’। বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার এই প্রকল্প যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করবে। পানিসম্পদের স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশ কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিস্তা নিয়ে ভারতের এই উদ্বেগের মূল কারণ তাদের নিজেদের দীর্ঘদিনের অনীহা। ২০১১ সাল থেকে ঝুলে থাকা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অজুহাতে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে অমীমাংসিত রয়েছে। খরা মৌসুমে উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হয়, আবার বর্ষায় পানি ছেড়ে দেওয়ায় সৃষ্টি হয় আকস্মিক বন্যা ও নদীভাঙন। আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী নিজের ভূখণ্ডের ভেতরে নদী খনন, তীর সংরক্ষণ এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার মহাপরিকল্পনা গ্রহণের সার্বভৌম অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থেই এই পদক্ষেপ আবশ্যক।