ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে রাজধানী তেহরানে নেমেছে লাখো মানুষের ঢল। প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে ও জানাজায় অংশ নিতে ইরানজুড়ে এক অভূতপূর্ব আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমান, এই ঐতিহাসিক জানাজায় অংশ নিতে পারেন এক কোটিরও বেশি মানুষ, যা দেশটির ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম জনসমাবেশ হতে পারে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত বিদায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই তেহরানের কেন্দ্রীয় প্রার্থনা হলের বাইরে জড়ো হতে শুরু করেন হাজার হাজার মানুষ। মধ্যরাতের তীব্র শীত আর দীর্ঘ প্রতীক্ষাকে উপেক্ষা করে মানুষের ঢল ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। সমবেতদের অনেকেই আশা করেছিলেন, রাতের মধ্যেই প্রার্থনা হলের প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। সেই প্রত্যাশায় প্রবীণ থেকে শুরু করে তরুণ—সব বয়সী মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন।
প্রার্থনা হলের চারপাশের সড়কগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন। তবুও জনতার মাঝে কোনো বিশৃঙ্খলা চোখে পড়েনি; বরং এক শান্ত ও গভীর শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে পুরো তেহরানজুড়ে। কালো পোশাকে আবৃত শোকাতুর মানুষেরা হাতে প্রিয় নেতার ছবি নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই কষ্টকে ছাপিয়ে গেছে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সোমাইয়ে নামের এক নারী সমবেতদের আবেগ তুলে ধরে বলেন, "আমরা আমাদের প্রিয় নেতার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকেই এখানে ছুটে এসেছি। এই দীর্ঘ অপেক্ষা যেমন শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্টের, তেমনি আমাদের হৃদয়ের কাছে এটি অত্যন্ত মধুর এক অভিজ্ঞতা।"
সেখানে উপস্থিত অধিকাংশ মানুষের কণ্ঠেই ছিল একই সুর। তাঁদের মতে, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের মর্যাদা রক্ষায় সর্বোচ্চ নেতা যে অনবদ্য অবদান রেখে গেছেন, তার তুলনায় এই কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা অত্যন্ত সামান্য বিষয়। দেশের প্রতি তাঁর আত্মত্যাগের মূল্য পরিশোধ করা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তাই বিদায়ের এই ক্ষণে পাশে থাকাটাই তাঁদের একমাত্র কর্তব্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এই বিদায় অনুষ্ঠানকে ঘিরে গভীর আবেগ লক্ষ্য করা গেছে। তেহরানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাতেমেহ বলেন, "আমাদের অভিভাবককে শেষ বিদায় জানাতে কোনো ধরনের ত্রুটি রাখা উচিত নয়। জাতি হিসেবে আমাদের ঐক্য প্রদর্শন করার এখনই উপযুক্ত সময়।"
আরেক শিক্ষার্থী মাহদি নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, "নেতার জানাজায় অংশ নিতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা অপেক্ষা করা আমাদের কাছে কিছুই মনে হচ্ছে না। চারপাশের মানুষের ভিড় দেখে মনে হচ্ছে, আমরা যেন নিজের পরিবারের কোনো অত্যন্ত প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় সদস্যের জানাজায় অংশ নিতে এসেছি।"
বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের এই অভূতপূর্ব মহাসমাবেশ কেবল একটি বিদায় অনুষ্ঠানই নয়, বরং এটি ইরানের জনগণের অভ্যন্তরীণ সংহতি এবং তাঁদের নেতৃত্বের প্রতি গভীর আস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, জানাজার মূল মঞ্চ এবং আশপাশের সড়কগুলোতে মানুষের আগমন অব্যাহত রয়েছে এবং ঐতিহাসিক এই জানাজা সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে দেশটির প্রশাসন।