দেওয়ালে তাজা রক্তের দাগ, উল্টে পড়ে থাকা নিরাপত্তা বেষ্টনী (ব্যারিকেড), ভাঙা কাচের টুকরো এবং রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শত শত জুতো-স্যান্ডেল। কোথাও পড়ে রয়েছে একটি স্কার্ফ, কোথাও বা ভেঙে যাওয়া চশমা আর ছেঁড়া শার্ট। ভারতের রাজধানী জুড়ে তৈরি হওয়া নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার স্পষ্ট স্মারক হিসেবেই ধুলোয় লুটিয়ে আছে এগুলো।
ভারতের প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রস্থল নয়া দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট (সংসদ সড়ক) এবং ঐতিহ্যবাহী কনট প্লেস এলাকা এখন পুলিশি দমন-পীড়নের গভীর ক্ষত বহন করছে। মেডিকেল ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং জালিয়াতির প্রতিবাদে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে এলে পুরো রাজধানী অচল হয়ে পড়ে।
বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের একটি বিশাল অংশ নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে সংসদের মূল প্রবেশদ্বারের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাস (টিয়ার গ্যাস) নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ শুরু করে। পুলিশের এই কঠোর অ্যাকশনে (পদক্ষেপ) একশরও বেশি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন, যাদের কয়েকজনের অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক।
১৮ বছর বয়সী আন্দোলনকারী অংশুল দেব তার ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না যে এটি আমাদের স্বাধীন ভারত। আমাদের অভিভাবকরা যে সরকারকে ভোট দিয়ে দেশের শাসনভার তুলে দিয়েছেন, তারা আজ আমাদের সাথে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের মতো ব্যবহার করছে। আমরা আমাদের দেশকে এই নোংরা রাজনীতি থেকে মুক্ত করতে রাস্তায় নেমেছি।"
বিশ্বের বৃহত্তম তরুণ বা প্রজন্ম জেড (জেন-জি) গোষ্ঠীর দেশ ভারতে গত কয়েক মাস ধরে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে নজিরবিহীন দুর্নীতির কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ফল বিপর্যয় ও প্রশ্ন ফাঁসের মানসিক চাপ সইতে না পেরে দেশে এ পর্যন্ত অন্তত ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন।
এত বড় জাতীয় সংকটের পরও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এখনো সম্পূর্ণ নীরব রয়েছেন। সোমবার যখন বাইরে শিক্ষার্থীরা রক্তাক্ত হচ্ছিলেন, তখন খুব কাছেই থাকা সংসদের ভেতরে প্রধানমন্ত্রীকে হাস্যোজ্জ্বল মুখে অংশ নিতে দেখা গেছে, যা আন্দোলনকারীদের ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার বিকেলে ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী নয়া দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। কংগ্রেসের অন্যান্য সংসদ সদস্যরাও তার সঙ্গে যোগ দিয়ে সরকারের এই অনমনীয় মনোভাবের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষক ও মোদীর জীবনীকার নিলঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের মতে, এই বিপুলসংখ্যক তরুণ সমাজের ক্ষোভ প্রধানমন্ত্রীর জন্য অন্যতম বড় একটি পরীক্ষা। তিনি উল্লেখ করেন, নরেন্দ্র মোদী সাধারণত কোনো আন্দোলনের কাছে সহজে মাথা নত করেন না। ভোটব্যাংকে বড় ধাক্কা না লাগা পর্যন্ত তিনি তার কঠোর ও আপসহীন ভাবমূর্তি (ইমেজ) ধরে রাখতে রাষ্ট্রীয় পশুবল প্রয়োগ করতেও দ্বিধা করবেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, মোদী সরকারের এই দমনমূলক নীতি এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি উদাসীনতা দীর্ঘদিনের স্বৈরতান্ত্রিক অভিযোগকেই আরও জোরালো করছে। তবে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকায় এবারের ছাত্র আন্দোলন সহজে দমে যাবে না বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।