১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় অবিভক্ত বাংলাকে পাকিস্তানের অংশ করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও গভীর ষড়যন্ত্র হয়েছিল বলে দাবি করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে পূর্ব ও পশ্চিমের রক্তক্ষয়ী দেশভাগের চরম ট্র্যাজেডি বা বিয়োগান্তক ঘটনার পরও বাংলা তার নিজস্ব অনন্য সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্যকে কখনো ধ্বংস হতে দেয়নি বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম 'দ্য প্রিন্ট'-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
শনিবার (২০ জুন) ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্মরণে আয়োজিত 'পশ্চিমবঙ্গ দিবস'-এর রাজ্য পর্যায়ের একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি (ইন্টারনেটের মাধ্যমে) বক্তব্য দেওয়ার সময় ইতিহাস ও রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ তুলে ধরেন নরেন্দ্র মোদি। সেখানে তিনি পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে বিশেষ কৃতিত্ব দেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী সরকারগুলো এই গৌরবময় ইতিহাস ও উত্তরাধিকারকে সাধারণ মানুষের চোখ থেকে আড়াল করে রেখেছে।
দেশভাগের প্রাক্কালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্মরণ করে নরেন্দ্র মোদি বলেন, সে সময় পুরো অবিভক্ত বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি সূক্ষ্ম চক্রান্ত গড়ে উঠেছিল। তখনকার রাজনৈতিক দল কংগ্রেস এই ষড়যন্ত্রকারী শক্তির কাছে নতি স্বীকার করেছিল। তবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং বাঙালি হিন্দুদের জন্য পৃথক আবাসভূমি (বাঙালি হিন্দু হোমল্যান্ড) গঠনের আন্দোলন গড়ে তোলেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনে তৎকালীন বহু খ্যাতনামা বাঙালি বুদ্ধিজীবী যুক্ত হয়েছিলেন। বিজ্ঞানসাধক মেঘনাদ সাহা, ইতিহাসবিদ আর সি মজুমদার ও যদুনাথ সরকার, প্রখ্যাত ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা এই আন্দোলনের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন। এছাড়া বিশিষ্ট শিল্পপতি জি ডি বিড়লা এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রখ্যাত নেতা পি আর ঠাকুরও এই দাবিকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন।
মোদির দাবি, এই আন্দোলনের ফলে তৎকালীন বিভাজনপন্থী শক্তিগুলো বুঝতে পেরেছিল যে পুরো বাংলাকে ভারতের বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এর ফলেই পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে থেকে যায়। বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক গুরুত্বের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গা ও নোয়াখালীর সহিংসতায় বহু সাধারণ মানুষ জীবন হারিয়েছিলেন। কিন্তু এত রক্তপাত এবং দেশভাগের মতো দুঃখজনক ট্র্যাজেডির পরও দুই বাংলার মানুষ তাদের নিজস্ব লোকসংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যকে পরম যত্নে টিকিয়ে রেখেছে।
পশ্চিমবঙ্গ দিবসের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০ জুন কেবল বর্ষপঞ্জির (ক্যালেন্ডার) একটি সাধারণ দিন নয়, এটি বাংলার অস্তিত্ব রক্ষার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। তরুণ প্রজন্মের এই লড়াইয়ের ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি।
ভাষণে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং বর্তমান শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের তীব্র সমালোচনা করেন মোদি। তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে এই দলগুলো পশ্চিমবঙ্গ দিবসের গুরুত্বকে খাটো করে দেখিয়েছে। দেশভাগের সময় যে কংগ্রেস বাংলা ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিল, পরবর্তীতে তারাই রাজ্যে তোষণমূলক রাজনীতি করেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। অবশেষে তিনি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলার সোনালী ভবিষ্যৎ ও নতুন ইতিহাস গড়ার আহ্বান জানান।