দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা সঞ্চয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বর্তমান রিজার্ভের পরিমাণ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে, যা বিশ্ববাজারের অস্থিরতার মাঝেও দেশের অর্থনীতির সক্ষমতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে জানানো হয়েছে, বর্তমানে দেশের মোট বা গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ১১৭ দশমিক ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। দেশীয় মুদ্রার হিসেবে যা ৩৫ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য। আজ বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল, ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে ডলারের সংকট এবং আমদানি ব্যয়ের চাপের মাঝেও রিজার্ভের এই অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্দেশিত বিপিএম-৬ (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল) পদ্ধতি অনুযায়ী বর্তমানে দেশের নিট বা প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৪৮৪ দশমিক ০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
উল্লেখ্য যে, মাত্র কয়েক দিন আগেই অর্থাৎ গত ২১শে এপ্রিল দেশের গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৫ হাজার ১২৫ দশমিক ৯০ মিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে তা ছিল ৩০ হাজার ৪৫৯ দশমিক ০১ মিলিয়ন ডলার। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গ্রস রিজার্ভে সামান্য হ্রাস-বৃদ্ধি থাকলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ ক্রমশ স্থিতিশীল হচ্ছে।
আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিজার্ভের এই হিসাব মূলত দুটি পদ্ধতিতে প্রকাশ করা হয়। একটি হলো ‘গ্রস রিজার্ভ’ যা দেশের হাতে থাকা মোট বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ নির্দেশ করে। অন্যটি হলো আইএমএফের ‘বিপিএম-৬’ পদ্ধতি, যেখানে মোট রিজার্ভ থেকে স্বল্পমেয়াদি দায়গুলো বাদ দিয়ে প্রকৃত ব্যয়যোগ্য অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের আমদানিব্যয় পরিশোধের সক্ষমতা এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষায় এই পরিমাণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক ধারা এই সঞ্চয় বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একটি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড কতটা শক্তিশালী, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর। বাংলাদেশের বর্তমান রিজার্ভ পরিস্থিতি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আমদানি ব্যয় মেটানোর ক্ষেত্রে সরকারকে কিছুটা নীতিগত স্বস্তি দেবে। তবে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে কেবল প্রবাস আয়ের ওপর নির্ভর না করে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে আরও জোর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, রিজার্ভের এই মজুত যেন কেবল পরিসংখ্যানের সংখ্যা না হয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাসেও ভূমিকা রাখে।