লেবাননের আকাশে যেন নেমে এসেছে আগুনের বৃষ্টি। মাত্র ১০ মিনিটের এক প্রলয়ংকরী অভিযানে বৈরুতসহ দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে ১০০টিরও বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এই নজিরবিহীন আগ্রাসনে শত শত মানুষ হতাহত হয়েছেন, যার ফলে লেবাননজুড়ে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার লেবাননের ওপর এই বিধ্বংসী আকাশপথের আক্রমণ চালায় ইসরায়েলি বিমানবাহিনী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ১০ মিনিটের সংক্ষিপ্ত ব্যবধানে একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে রাজধানী বৈরুতসহ দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননের বিশাল এলাকা। সাধারণত যেসব অঞ্চল হিজবুল্লাহর (লেবাননভিত্তিক রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগঠন) শক্তঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নয়, এবার সেসব এলাকাতেও ভারী বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অগণিত ঘরবাড়ি ধুলোয় মিশে যায়।
আকস্মিক এই হামলার ফলে লেবাননের চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাকান নাসেরেদ্দিন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে তিল ধারণের জায়গা নেই। শহীদ এবং আহতদের ভিড়ে এক নজিরবিহীন ও হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। লেবানন রেড ক্রস জানিয়েছে, দুর্গত এলাকাগুলো থেকে মুমূর্ষু মানুষকে সরিয়ে নিতে তাদের অন্তত ১০০টি ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা যান বা অ্যাম্বুলেন্স নিরলসভাবে কাজ করছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেক মানুষ চাপা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই বর্বর হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন। তিনি একে মানবিক মূল্যবোধের চরম অবমাননা এবং ইসরায়েলের কালিমালিপ্ত ইতিহাসে এক নতুন কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেছেন। এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট আউন বলেন, এই পৈশাচিক আগ্রাসন কোনো আন্তর্জাতিক অধিকার বা রীতির তোয়াক্কা করে না। কোনো চুক্তি বা অঙ্গীকারের প্রতি দেশটির বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই। এই হামলা প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোই তাদের মূল নীতি।
যুদ্ধের এই নতুন মাত্রা এমন এক সময়ে এল যখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি (সাময়িকভাবে যুদ্ধ বন্ধ রাখা) নিয়ে আলোচনা চলছিল। তেহরান থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, এই যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন সীমান্তও থাকবে। তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুরু থেকেই সেই সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে আসছিলেন। তার এই অনড় অবস্থানের প্রতিফলনই দেখা গেল বৈরুতজুড়ে ছড়ানো এই ধ্বংসলীলায়।
এদিকে ইসরায়েলের সামরিক নেতৃত্ব তাদের অবস্থান আরও কঠোর করার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো ধরনের আপস বা আলোচনা ছাড়াই হিজবুল্লাহর ওপর হামলা অব্যাহত থাকবে। তাদের লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া, আর এর জন্য তারা যেকোনো পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত।
বর্তমানে লেবাননের রাজপথগুলোতে ঘরবাড়ি হারানো মানুষের আহাজারি শোনা যাচ্ছে। হাজার হাজার পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে কিংবা শহরের নিরাপদ এলাকায় ছুটছেন। জ্বালানি সংকট আর হাসপাতালের শয্যা স্বল্পতায় আহতদের চিকিৎসা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও হামলার তীব্রতা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এটি কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা নয়, বরং সাধারণ নাগরিকদের মনে এক দীর্ঘমেয়াদী ত্রাস সৃষ্টির অপচেষ্টা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
লেবাননে ইসরায়েলের এই বেপরোয়া হামলা কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যখন বিশ্বনেতারা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজছেন, তখন ১০ মিনিটে ১০০টি বিমান হামলা চালিয়ে শান্তির সব পথ যেন রুদ্ধ করে দেওয়া হলো। এই শক্তির আস্ফালনে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ নারী ও শিশু, ধ্বংস হচ্ছে সাজানো গোছানো জনপদ। বিশ্ববিবেক যদি এখনই এই ধ্বংসযজ্ঞ থামাতে কার্যকর ভূমিকা না নেয়, তবে এই আগুন খুব দ্রুত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে, যার মাশুল দিতে হবে গোটা মানবসভ্যতাকে।