প্রশান্ত মহাসাগরে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, যার ফলে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে এল নিনো। আবহাওয়াবিদদের নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’তে রূপ নিতে পারে, যা আগামী বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী চরম খরা, বন্যা, তীব্র দাবদাহ এবং ভয়াবহ খাদ্যসংকটের কারণ হতে পারে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাধারণত এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এবারের উষ্ণতার গতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনোগ্রাফিক অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) জানিয়েছে, আগামী এক মাসের মধ্যেই এল নিনোর আনুষ্ঠানিক প্রভাব শুরু হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আবহাওয়া সংস্থাগুলোর মডেলগুলো বলছে, চলতি বছরের শেষ দিকে এটি ‘সুপার এল নিনো’র রূপ নিতে পারে।
এল নিনোর তীব্রতা পরিমাপের জন্য বিজ্ঞানীরা ‘নিনো ৩.৪’ নামে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের তাপমাত্রার ওপর নজর রাখেন। যখন এই অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যায়, তখন সেটিকে শক্তিশালী বা সুপার এল নিনো হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ইসিএমডব্লিউএফ (ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টস)-এর পূর্বাভাস বলছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এমনকি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে। যদি এমনটি ঘটে, তবে তা ১৮৭৭ সালের সর্বোচ্চ রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাবে, যা সে সময় এশিয়া, আফ্রিকা ও ব্রাজিলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও লাখো মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল।
এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব শুধু সমুদ্রসীমায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সারা বিশ্বের আবহাওয়ায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করবে। অধ্যাপক লিজ স্টিফেন্সের মতে, এটি যদি সত্যিই সুপার এল নিনোতে পরিণত হয়, তবে আগামী বছরটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হিসেবে গণ্য হতে পারে। এল নিনোর প্রভাবে পেরু ও ইকুয়েডরে বন্যার প্রকোপ বাড়তে পারে, অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল অংশে তীব্র খরা ও দাবানলের আশঙ্কা রয়েছে। দাবানল ও খরা দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষিজ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যা বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে একটি বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের সংকেত হিসেবে দেখছেন। বিশ্বজুড়ে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সারের সরবরাহ চেইন ও কৃষি উপকরণ আগে থেকেই চাপে আছে। এমতাবস্থায় এল নিনোর কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হলে খাদ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে যারা আগে থেকেই দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত, তারা সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। এছাড়া আটলান্টিক অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় কমে আসার সম্ভাবনা থাকলেও, তা মধ্য আমেরিকায় চরম শুষ্ক আবহাওয়া ও বৃষ্টির অভাব তৈরি করবে, যা সেখানকার বাস্তুসংস্থান ও কৃষির জন্য বড় হুমকি।
কিছু আবহাওয়াবিদের মতে, এল নিনোর ফলে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের কিছু অঞ্চলে শীতের তীব্রতা বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। সব মিলিয়ে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই দানবীয় রূপ পৃথিবীর খাদ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এল নিনোর এই পূর্বাভাস আমাদের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা। প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারালে মানুষ কতটা অসহায় হয়ে পড়ে, তা এই সুপার এল নিনোর আশঙ্কাই প্রমাণ করছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা হয়তো এই বিশাল বিপর্যয় ঠেকাতে পারবে না, কিন্তু বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের উচিত খাদ্য মজুত এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি এখন থেকেই জোরদার করা। জলবায়ু পরিবর্তনের দায়ভার কেবল প্রকৃতির নয়, বরং মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত কার্যক্রমও এই বিপর্যয়ের অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। আমরা কি তবে আগামী দিনের বড় ধরনের খাদ্যসংকট ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত?