নেপালের রাজনীতিতে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। ব্যক্তিগত বিনিয়োগ ও নৈতিকতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠায় পদত্যাগের পথ বেছে নিলেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং। বুধবার (২২ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক বার্তার মাধ্যমে তিনি এই নাটকীয় ঘোষণা দেন।
হিমালয় কন্যা নেপালের নতুন সরকার গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই বড় ধরনের ধাক্কা খেলো দেশটির মন্ত্রিসভা। বিনিয়োগ সংক্রান্ত অস্পষ্টতা ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে বিতর্কের জেরে পদত্যাগ করেছেন ৩৮ বছর বয়সী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং। বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
সুদান গুরুং তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “আমার কাছে পদের চেয়ে নীতিবোধ অনেক বড় এবং জনআস্থার চেয়ে বড় শক্তি আর কিছু নেই।” তিনি সরাসরি কোনো অভিযোগের বিস্তারিত না বললেও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তাকে নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। নেপালের রাজনীতিতে সাধারণত দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে প্রভাবশালীরা পদ আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করলেও গুরুংয়ের এই পদক্ষেপ দেশটিতে নতুন এক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য, সুদান গুরুং এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলি এবং বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখকের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়ে ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন। গত সেপ্টেম্বরে দেশটিতে হওয়া তরুণ প্রজন্মের বিক্ষোভ দমনে তাদের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে তদন্তের সূত্রে তিনি গ্রেফতারের নির্দেশও দিয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তার নিজের শেয়ার এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক লেনদেন নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও প্রশ্ন তৈরি হয়। গুরুং জানিয়েছেন, নাগরিক সমাজের এই উদ্বেগ ও মন্তব্যকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছেন বলেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ’র সহযোগী দীপা দাহাল জানিয়েছেন, গুরুং ইতিমধ্যে তার পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে জমা দিয়েছেন। পরবর্তী ঘোষণা না আসা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নিজেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করবেন। ৩৫ বছর বয়সী জনপ্রিয় শিল্পী থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া বালেন্দ্র শাহ গত মাসে এক চমকপ্রদ নির্বাচনে বিজয় লাভ করেন। তার নবগঠিত রাজনৈতিক দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ মূলত দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন ও স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় আসে।
কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে তিন বছরের সফল ও সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য বালেন্দ্র শাহ তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে তার মন্ত্রিসভায় অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে শুরু থেকেই। চলতি মাসের শুরুর দিকেই পদের অপব্যবহার করে স্ত্রীকে স্বাস্থ্য বীমা বোর্ডের সদস্য করার দায়ে শ্রমমন্ত্রী দীপক কুমার শাহকে বরখাস্ত করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর সুদান গুরুংয়ের পদত্যাগ সেই স্বচ্ছতার রাজনীতিরই অংশ কি না, তা নিয়ে দেশজুড়ে চলছে ব্যাপক বিশ্লেষণ।
নেপালের এই ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। পদের চেয়ে নীতিবোধ বড়—সুদান গুরুংয়ের এই উক্তি যদি সত্যিই হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে এসে থাকে, তবে তা প্রশংসার দাবি রাখে। সাধারণত জনমনে প্রশ্ন উঠলে তা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি আমাদের এই অঞ্চলে প্রবল। নেপালের এই তরুণ নেতৃত্ব কি তবে সুশাসনের এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করতে যাচ্ছে? সময় এবং তদন্তই বলে দেবে এই পদত্যাগ কেবল রাজনৈতিক কৌশল নাকি সত্যিকার অর্থেই স্বচ্ছতার বহিঃপ্রকাশ।