দুর্নীতির জগদ্দল পাথর সরাতে নেপালে এবার শুরু হলো নজিরবিহীন শুদ্ধি অভিযান। তরুণ প্রজন্মের আস্থার প্রতীক ও নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ক্ষমতা গ্রহণের পর দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একধাপ এগিয়ে সাবেক ও বর্তমান প্রভাবশালী রাজনীতিকদের অবৈধ সম্পদ খতিয়ে দেখতে গঠন করেছেন শক্তিশালী তদন্ত প্যানেল (তদন্ত কমিটি)।
হিমালয়কন্যা নেপালের রাজনীতিতে এখন পরিবর্তনের ঝোড়ো হাওয়া বইছে। দীর্ঘদিনের পুরনো রাজনৈতিক ধারাকে পেছনে ফেলে দেশটির ‘জেড প্রজন্ম’ (১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০১০-এর শুরুর দিকে জন্মানো তরুণ গোষ্ঠী) গত সাধারণ নির্বাচনে আমূল পরিবর্তন এনেছে। প্রথাগত রাজনীতিবিদ কেপি শর্মা অলির পতনের পর তারা দেশটির শাসনভার তুলে দিয়েছেন তরুণ র্যাপার এবং মেধাবী প্রকৌশলী বালেন্দ্র শাহর হাতে। ক্ষমতা নিয়েই বালেন্দ্র শাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, দুর্নীতির প্রশ্নে তিনি বিন্দুমাত্র আপস করবেন না। সেই হুঙ্কারই এবার বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে।
নেপাল সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্যানেল গঠন করা হয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রাজেন্দ্র কুমার ভান্ডারির নেতৃত্বে এই কমিটি কাজ করবে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি কোনো লোকদেখানো অভিযান নয়; বরং সম্পূর্ণ আইনি মানদণ্ড বজায় রেখে এবং অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে এই তদন্ত পরিচালিত হবে। কমিটির সুপারিশ ও তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই তদন্তের আওতা হবে বেশ বিস্তৃত। বিশেষ করে ২০০৮ সালে নেপালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর থেকে এ পর্যন্ত যারা ক্ষমতায় ছিলেন, সেই শত শত রাজনীতিক ও আমলাদের আর্থিক লেনদেন ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব কড়া নজরদারিতে আনা হতে পারে। নির্বাচনের সময় বালেন্দ্র শাহর দল ‘আরএসপি’র প্রধান প্রতিশ্রুতিই ছিল দেশ থেকে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করা। প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোকে হঠিয়ে তাদের এই জয় যে নিছক কোনো চমক ছিল না, তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে বালেন্দ্র সেটিই প্রমাণ করলেন।
দুর্নীতি দমনের পাশাপাশি কূটনীতিতেও বালেন্দ্র শাহ ইতোমধ্যে চমক দেখিয়েছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে একসঙ্গে ১৭টি দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে তিনি নেপালের অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং কোনো বিশেষ শক্তির দিকে ঝুঁকে না থেকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। বালেন্দ্র শাহর এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপকে নেপালের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার একটি সমন্বিত প্রয়াস হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা।
নেপালের এই ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এক বিশেষ বার্তা বহন করে। বছরের পর বছর ধরে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের এই জাগরণ প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ এখন আর কেবল আশ্বাসে সন্তুষ্ট নয়, তারা কাজের প্রতিফলন চায়। বালেন্দ্র শাহর এই তদন্ত প্যানেল যদি সফলভাবে রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় আনতে পারে, তবে তা হবে এ অঞ্চলের রাজনীতির ইতিহাসে এক বড় মাইলফলক। তবে দেখার বিষয় হলো, দুর্নীতির শেকড় কত গভীর এবং এই তরুণ নেতৃত্ব কতটুকু প্রতিকূলতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।