রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চললেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্কের বরফ গলছে না। দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক সত্ত্বেও পাঁচটি প্রধান অমীমাংসিত বিষয়ের কারণে শান্তি সমঝোতা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
প্রায় ৪০ দিনের ভয়াবহ লড়াই শেষে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধবিরতি পালন করছে। তবে শান্তির পথে হাঁটার এই সুযোগটি কাজে লাগানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই দেশের অনড় অবস্থান। গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা ম্যারাথন বৈঠকে বসলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আগামীকাল বুধবার এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে চললেও নতুন কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের অনাগ্রহ এবং ওয়াশিংটনের কঠোর নীতি এই পুরো প্রক্রিয়াকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রধানত পাঁচটি ইস্যু নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পাহাড়সম দূরত্ব বজায় রয়েছে। প্রথমত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া হলো ইরান যেন পুরোপুরি এই কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তবে তেহরান এই প্রস্তাব মানতে নারাজ; তারা চায় যেকোনো বিধিনিষেধ কেবল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য হোক। দ্বিতীয়ত, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের কাছে থাকা প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। ইরান এই প্রস্তাবকে শুরুতেই সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
তৃতীয়ত, সমুদ্রপথে বাণিজ্যের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এই প্রণালিতে তারা নৌযান চলাচল স্বাভাবিক হতে দেবে না। বিপরীতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান হলো, চূড়ান্ত কোনো চুক্তি হওয়ার আগে অবরোধ সরানোর প্রশ্নই আসে না। চতুর্থ বিষয়টি হলো ইরানের জব্দ করা সম্পদ। তেহরান দাবি করেছে, স্থায়ী সমঝোতার শর্ত হিসেবে বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা তাদের প্রায় ২০ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলারের সম্পদ অবিলম্বে মুক্ত করে দিতে হবে।
সর্বশেষ এবং সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন দাবিটি হলো যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ইরান প্রায় ২৭০ বিলিয়ন (২৭ হাজার কোটি) ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। এই বিশাল অঙ্কের দাবি পূরণ করা ওয়াশিংটনের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ফলে প্রতিটি ইস্যুতেই একে অপরের বিপরীত মেরুতে অবস্থান করায় বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে যুদ্ধের মেঘ জমছে। ইসলামাবাদ বৈঠকের ব্যর্থতা প্রমাণ করেছে যে, কূটনৈতিক টেবিলে কেবল আলোচনার সদিচ্ছা থাকলেই হয় না, বরং ছাড় দেওয়ার মানসিকতাও জরুরি।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই দাবার চালে কেউই হার মানতে রাজি নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই অনড় অবস্থান কেবল তাদের নিজেদের জন্য নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। আগামীকাল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দুই দেশ আবারও সংঘাতের পথে হাঁটবে নাকি শেষ মুহূর্তে শুভবুদ্ধির উদয় হবে, তা এখন বিশ্ববাসীর জন্য উদ্বেগের বিষয়। শান্তির জন্য দুই পক্ষকেই হয়তো কিছুটা নমনীয় হতে হবে, অন্যথায় এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা বড় কোনো যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিতে পারে।