পিরোজপুরে হঠাৎ করেই আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে হাম রোগের সংক্রমণ। আক্রান্ত শিশুদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে ১০০ শয্যার জেলা হাসপাতাল। শয্যাসংকটের কারণে বারান্দা ও মেঝেতে ঠাঁই হয়েছে শিশুদের, যা নিয়ে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন অভিভাবকরা।
পিরোজপুর জেলা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মাত্র ১৪টি শয্যার বিপরীতে বর্তমানে সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছে ৭০ জন শিশু। এদের বড় একটি অংশ হামে আক্রান্ত, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ। শুধু শিশু ওয়ার্ড নয়, পুরো হাসপাতালটি এখন অতিরিক্ত রোগীর চাপে বিপর্যস্ত। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় আড়াইশ। হাসপাতালের বাকি ৮৬টি শয্যার বিপরীতে আরও প্রায় ১৬০ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন, যার ফলে চিকিৎসাসেবা প্রদানে হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এখন পর্যন্ত ৩৩৭ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে ২০ জনের শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা ২১১ জন শিশুকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১৯২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে এখনো অনেক শিশু হাসপাতালে ভর্তি থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
সরেজমিনে হাসপাতালের চিত্র বেশ করুণ। প্রতিটি বেডে একাধিক শিশুকে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। অনেককে হাসপাতালের বারান্দায় বা মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ ও দুশ্চিন্তা প্রকাশ করছেন অভিভাবকরা। নাজিরপুর থেকে আসা ইলিয়াস হোসেন জানান, স্থানীয় হাসপাতালে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ছেলেকে নিয়ে সদর হাসপাতালে এসেছেন। কিন্তু এখানেও শয্যার জন্য হাহাকার করতে হচ্ছে।
অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার বিষয়ে জানতে চাইলে চিকিৎসকরা জানান, হামের পাশাপাশি ডেঙ্গু পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাদের। তবে আশার কথা হলো, এখন পর্যন্ত জেলায় হামে আক্রান্ত কোনো শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। সীমিত জনবল ও অবকাঠামো নিয়ে চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নিরলসভাবে কাজ করছি। আমাদের চিকিৎসক ও নার্সরা নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে অভিভাবকদের সচেতনতা এখানে সবচেয়ে জরুরি। শিশুদের সময়মতো টিকার আওতায় আনা গেলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে আরও জানানো হয়, কোনো শিশুর শরীরে উচ্চ জ্বর, লালচে দানা বা র্যাশ ওঠা কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে। হাম প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৫ এপ্রিল থেকে জেলায় ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চলমান রয়েছে।
পিরোজপুরের এই পরিস্থিতি আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, সচেতনতাই রোগ প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার। মহামারি বা কোনো ছোঁয়াচে রোগের ক্ষেত্রে হাসপাতালের সক্ষমতা প্রায়ই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, যার চরম খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। প্রশাসনের পাশাপাশি আমাদের অভিভাবকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে, যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অহেতুক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে না পড়ে।