দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুর আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চলে আঘাত হানা ৫ দশমিক ৫ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয়জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া এই ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩০ জনেরও বেশি মানুষ এবং প্রায় ৩০০ বাসিন্দা সম্পূর্ণ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেকে চাপা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপি (অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার (১৮ জুলাই) স্থানীয় সময় রাত ৯টা ২৪ মিনিটে এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বা ইউএসজিএস (ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল হুয়ানকায়ো প্রদেশের সিকায়া শহর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণ-পশ্চিমে। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার, যা অগভীর হওয়ার কারণে কম্পনের তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতিের পরিমাণ বেশি হয়েছে।
পেরুর জাতীয় বেসামরিক প্রতিরক্ষা ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের কারণে উদ্ধারকাজে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কতজন নিখোঁজ রয়েছেন, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হয়নি। ভূমিকম্পের তীব্রতায় ওই অঞ্চলের বহু বাড়িঘর সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে অথবা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক স্থানীয় গির্জা এবং একটি নানদের থাকার মঠ বা কনভেন্টও রয়েছে।
স্থানীয় বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা লুইস ভাসকেজ জানান, দুর্গম আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চলের বেশিরভাগ ঘরবাড়ি স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী উপাদান কাঁচা মাটি ও খড় দিয়ে তৈরি ‘অ্যাডোবি’ (এক ধরণের কাঁচা রোদে পোড়ানো ইট) দিয়ে নির্মিত। ভূমিকম্প সহনশীল না হওয়ায় এই দুর্বল কাঠামোর ঘরগুলো মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে, যা প্রাণহানির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চোঙ্গো বাজো নামের একটি কৃষিপ্রধান নিচু অঞ্চল। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত চিত্রে দেখা যায়, কনকনে ঠান্ডার মধ্যে সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে কম্বল গায়ে দিয়ে শত শত মানুষ রাত কাটাচ্ছেন। মাঠের গবাদিপশুগুলোও বড় বড় মাটির চাঙ্গাড় ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছটফট করছে। দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়া হারমেনেগিলদা গুয়ামালাতো নামের তিন সন্তানের এক মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার সাজানো গোছানো ঘরটি চোখের পলকে মাটির সাথে মিশে গেছে। এখন বাচ্চাদের নিয়ে পাশের হুয়াইউকাচি জেলায় একটু আশ্রয়ের খোঁজে যাচ্ছি।”
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পেরু অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ ( মহাসাগরীয় তীব্র ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি প্রবণ বলয়) অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে প্রায়ই মাঝারি থেকে শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। এর আগে ২০০৭ সালে দেশটির ইকা অঞ্চলের পিসকো প্রদেশে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার এক ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল, যাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ৬০০ মানুষ। নতুন এই ভূমিকম্পটি ২০০৭ সালের সেই ভয়ানক স্মৃতির কথাই আবারও মনে করিয়ে দিল।