অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি শিশুদের শিক্ষার পথে নতুন প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের দেওয়া কাঁটাতারের বেড়া। প্রতিদিনের চিরচেনা পথ বন্ধ করে দেওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিকল্প পথে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের, যা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
অবরুদ্ধ ও অশান্ত পশ্চিম তীরের উম্ম আল-খাইর গ্রামে ফিলিস্তিনি শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি স্থানীয় ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রধান পথটিতে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে অনেক শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়া অনিয়মিত হয়ে পড়েছে, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক পথ ব্যবহার করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পার্শ্ববর্তী কারমেল নামক অবৈধ বসতি থেকে আসা উগ্রপন্থীরাই পরিকল্পিতভাবে এই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
গ্রাম পরিষদের প্রধান খলিল হাতালিন গণমাধ্যমকে জানান, এই পথটি ছিল শিশুদের জন্য একমাত্র নিরাপদ যাতায়াতের মাধ্যম। এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে শিশুদের এখন দীর্ঘ এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা সরাসরি ইহুদি বসতিগুলোর খুব কাছ দিয়ে চলে গেছে। সেখানে বসতি স্থাপনকারীদের হাতে শিশুদের লাঞ্ছিত বা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। তিনি আরও জানান, টানা দ্বিতীয় দিনের মতো অনেক শিশু বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারেনি। দখলদার বাহিনী তাদের এমন এক দীর্ঘ পথ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে যা কার্যত শিশুদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। খলিল হাতালিন জোর দিয়ে বলেন, তারা তাদের চিরাচরিত প্রধান পথটিই ব্যবহার করতে চান যা যুগের পর যুগ ধরে ফিলিস্তিনিরা ব্যবহার করে আসছে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এটি কেবল একটি যাতায়াতের পথ বন্ধ করার বিষয় নয়; বরং এটি ফিলিস্তিনিদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার একটি বৃহত্তর নীল নকশার অংশ। বসতি স্থাপনকারীরা এবং দখলদার বাহিনী যৌথভাবে ফিলিস্তিনিদের প্রাত্যহিক জীবনে অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করছে। শিশুদের স্কুলে যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে আসলে পরিবারগুলোকে আতঙ্কিত করা হচ্ছে, যাতে তারা বাধ্য হয়ে নিজেদের এলাকা ছেড়ে চলে যায়। একে অনেকেই 'জাতিগত নিধন' (একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে এলাকা থেকে নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া) হিসেবে অভিহিত করেছেন।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি স্থল অভিযান শুরুর পর থেকে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ ও নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। নতুন নতুন তল্লাশি চৌকি (চেকপোস্ট), সড়কের মাঝখানে বড় পাথর বা লোহার গেট দিয়ে স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব ইহুদি বসতি সম্পূর্ণ অবৈধ হলেও বাস্তবে এর বিস্তার থামছে না। যুদ্ধের আবহে এই অবৈধ দখলদারিত্ব আরও জোরালো হয়েছে, যার প্রধান শিকারে পরিণত হচ্ছে সাধারণ নিরপরাধ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা।
একটি শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার অধিকার সর্বজনীন এবং মৌলিক মানবাধিকার। যখন শিক্ষার পথে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়, তখন সেটি কেবল পথ বন্ধ করা নয়, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা। পশ্চিম তীরের এই চিত্র বিশ্ববিবেকের কাছে এক বড় প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—রাজনৈতিক সংঘাতের বলি কেন হবে অবোধ শিশুরা? আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি কেবল নিন্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এই শিশুদের নিরাপদ পথ নিশ্চিত করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেবে?