ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি আলোচনায় এখন সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস হয়ে দাঁড়িয়েছে তেহরানের জব্দ হওয়া বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সম্পদ। তেলের অর্থ থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঞ্চিতি—সবই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে বিভিন্ন দেশের সিন্দুকে তালাবদ্ধ হয়ে আছে।
টকে থাকা অর্থ ফেরত দেওয়া। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আসন্ন দ্বিতীয় ধাপের বৈঠককে সামনে রেখে এই বিষয়টি এখন বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইরানের প্রায় ১০০ বিলিয়ন (এক হাজার কোটি) ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ আটকে আছে। এই বিশাল অংকের অর্থ যদি ইরান ফিরে পায়, তবে দেশটির ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে।
ইরানের এই সম্পদের তালিকায় রয়েছে তেল ও গ্যাস বিক্রির বকেয়া অর্থ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংরক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রা, বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে জমা রাখা আমানত এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বিনিয়োগ। বর্তমানে চীন, ভারত, ইরাক, কাতার, জাপান এবং ইউরোপের বেশ কিছু দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এই অর্থ পড়ে আছে। হিসাব অনুযায়ী, চীনে আটকে আছে অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলার, ভারতে প্রায় ৭ বিলিয়ন, ইরাকে ৬ বিলিয়ন, কাতারে ৬ বিলিয়ন এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি ইরানের প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার জব্দ হয়ে আছে।
এই সম্পদ জব্দের ইতিহাস বেশ পুরোনো। এর সূচনা ঘটেছিল ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের সময়। সেই ঘটনার জেরে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবার ইরানের সম্পদে হাত দেয়। পরবর্তীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দফায় দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ব্যাংক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর হিসাবে সংরক্ষিত অর্থ ইরান আর উত্তোলন বা স্থানান্তর করতে পারেনি।
নিষেধাজ্ঞা, আদালতের নির্দেশ কিংবা নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ইরান নিজের তেল বিক্রির টাকাও এখন প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারছে না। অনেক সমালোচক মনে করেন, এটি কেবল অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং ইরানকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার একটি বড় কৌশল। দীর্ঘদিনের এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানে বর্তমানে আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি (পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি), মুদ্রার মান কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
যদি এই জব্দ হওয়া সম্পদ তেহরান ফিরে পায়, তবে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার বা রিজার্ভ শক্তিশালী হবে। এতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান স্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি আমদানি ব্যয় মেটানো সহজ হবে। একই সঙ্গে তেল উত্তোলন খাত, বিদ্যুৎ ও পানিশোধন প্রকল্প এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বড় ধরনের বিনিয়োগ সম্ভব হবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন এবং শিল্পখাতের আধুনিকায়নে এই অর্থ ইরানের জন্য লাইফলাইন বা সঞ্জীবনী হিসেবে কাজ করবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থকে সবসময় একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ইরানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে দেখার বিষয় হলো, আলোচনার টেবিলে এই বিপুল সম্পদ মুক্তির বিনিময়ে তেহরানকে আর কতটুকু ছাড় দিতে হয়। যদি এই সম্পদ সত্যিই মুক্ত হয়, তবে তা কেবল ইরানের জন্য নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্যেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে এই 'লৌহ সিন্দুকে'র চাবি কার হাতে থাকবে, তার ওপর।