ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেকে চাপা পড়ে থাকায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কারলোস আলভ্যারাডো জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া আক্রান্তদের একটি বড় অংশই হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে পথেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া এক জরুরি সাক্ষাৎকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “এটি অত্যন্ত দুঃখজনক পরিস্থিতি। উদ্ধারকর্মীরা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন, কিন্তু আঘাতপ্রাপ্ত অন্তত ২৩৫ জনকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল যারা হয় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছেন, নয়তো আনার পথেই প্রাণ হারিয়েছেন।” হাসপাতালগুলোতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে এবং চিকিৎসকেরা আহতদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।
ভূমিকম্পের তীব্রতায় দেশটির বহু ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারী দলগুলো সময়মতো পৌঁছাতে পারছে না। স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। তীব্র ঠান্ডার পাশাপাশি খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট কবলিত এলাকায় মানবিক বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
এদিকে এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহারের জোর দাবি উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক খ্যাতিমান গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ’ (অর্থনৈতিক ও নীতি গবেষণা কেন্দ্র বা সিইপিআর) এই মানবিক সংকটে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বর্তমান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে বিদেশি সরকার, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বৈশ্বিক মানবিক সহায়তাকারী দলগুলোর জন্য ভেনেজুয়েলায় জরুরি অর্থ ও ত্রাণ পাঠানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এই জটিলতার কারণে ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার অভিযান এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি পুনর্বাসন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
সিইপিআরের আন্তর্জাতিক নীতি বিষয়ক পরিচালক অ্যালেক্স মেইন এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা অতীতের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়েও দেখেছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা কীভাবে ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি আন্তর্জাতিক ত্রাণ কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করেছে।” তিনি আরও যোগ করেন, ভেনেজুয়েলা সরকারকে কোনো রাজনৈতিক শর্ত ছাড়া স্বাধীনভাবে বৈশ্বিক সহায়তা গ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের মধ্যে তা দ্রুত বণ্টনের সুযোগ দেওয়া উচিত। চলমান মার্কিন ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা এই ত্রাণ প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত দুর্বল করে ফেলছে।
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভূমিকম্পের কারণে এমনিতেই ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ ভেনেজুয়েলা এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এই অবস্থায় নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার করা না হলে লাখ লাখ মানুষ মৌলিক অধিকার ও চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন। ফলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।