ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূলে আঘাত হেনেছে বিগত এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূমিকম্প। পরপর দুটি তীব্র ভূকম্পনে কেঁপে উঠেছে দক্ষিণ আমেরিকার এই গোটা দেশ। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩২ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েক শত মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেকে চাপা পড়ে থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়ার আশঙ্কা করছে স্থানীয় প্রশাসন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা ৪ মিনিট) আঘাত হানে এই শক্তিশালী ভূমিকম্প। সংস্থাটি জানিয়েছে, এটি গত ১০০ বছরের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় অনুভূত হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকম্পন। রিখটার স্কেলে মূল ভূমিকম্পটির তীব্রতা ছিল ৭ দশমিক ৫। তবে সবচেয়ে ভীতিজনক বিষয় ছিল, মূল কম্পনটি আঘাত হানার ঠিক ৪০ সেকেন্ড আগে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি প্রাক-কম্পন বা ফোরশক (মূল কম্পনের আগের মৃদু আভাস) অনুভূত হয়েছিল। পরপর দুটি শক্তিশালী ঝাঁকুনিতে মুহূর্তের মধ্যে পুরো দেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে দেখা যায়, ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে এর চেয়ে বড় ভূমিকম্প হয়েছিল আজ থেকে ১২০ বছরেরও বেশি সময় আগে, ১৯০০ সালে। সে সময় দেশটির রাজধানী কারাকাসের কাছাকাছি উত্তর উপকূলে আঘাত হেনেছিল ৭ দশমিক ৭ মাত্রার এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প। বুধবারের এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বা কেন্দ্র ছিল ১৯০০ সালের সেই ঐতিহাসিক ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে মাত্র কয়েক শ কিলোমিটার দূরে।
ভূবৈজ্ঞানিক রেকর্ড অনুসারে, বুধবারের ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এই ভূমিকম্পটি ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম ভূমিকম্প হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। আর এর ঠিক ৪০ সেকেন্ড পূর্বে আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ মাত্রার প্রাক-কম্পনটি দেশের ইতিহাসে চতুর্থ বৃহত্তম ভূমিকম্প হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।
পরপর দুটি বড় ধরনের ধাক্কায় রাজধানী কারাকাস ও তার আশেপাশের অঞ্চলের বহু বহুতল ভবন এবং ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। পুরো অঞ্চলজুড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং সড়কগুলোতে ব্যাপক ফাটল দেখা দিয়েছে। ভয়াবহ এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের আশায় দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন শত শত উদ্ধারকর্মী ও জরুরি সেবাদানকারী দলের সদস্যরা।
ভূমিকম্পের প্রত্যক্ষদর্শী কারাকাসের এক বাসিন্দা মারিয়া আলেজান্দ্রা সেই ভয়াবহ মুহূর্তের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের কাছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, "চারপাশে শুধু ধুলো আর ধোঁয়ার মেঘ জমেছিল, কিছুই দেখা যায়নি। যখন আমরা প্রাণভয়ে নিচে নেমে এলাম, চারপাশের দৃশ্যটা দেখে মনে হচ্ছিল আমরা যেন কোনো ভৌতিক চলচ্চিত্রের (হরর মুভি) ভেতর দাঁড়িয়ে আছি।"
মারিয়া আরও জানান, ভূমিকম্পের প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে তাঁর ঘরের দেয়ালগুলোতে বড় বড় ফাটল ধরেছিল। প্রধান দরজাটি আটকে যাওয়ায় সেটি ভেঙে তাঁদের বাইরে বের হতে হয়। ধ্বংসস্তূপ ও ভাঙা ইটের ওপর দিয়ে বেয়ে তাঁরা নিচে নামেন। চারিদিকে মানুষের চিৎকার ও কান্নার রোল পড়েছিল। উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বর্তমানে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।