উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপ পাড়ি দেওয়াই কাল হলো। ভূমধ্যসাগরের ভয়াল ঢেউয়ে ডুবে যাওয়া একটি নৌকার অন্তত ১৫ জন অভিবাসীর নিথর দেহ ভেসে এসেছে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে। গত এক সপ্তাহে উদ্ধার হওয়া এই মরদেহগুলোর মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি স্থানীয় নৌবাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে শনিবার (২০ জুন) নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স।
প্রাণে বেঁচে ফেরা ১০ জন হতভাগ্য যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে ভয়াবহ সেই রাতের বর্ণনা পেয়েছে উদ্ধারকারী দল। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ছোট আকারের ওই নৌকাটিতে ধারণক্ষমতার বাইরে প্রায় ৬১ জন আরোহী ছিলেন। উত্তাল সাগরে টিকতে না পেরে সেটি মাঝপথে তলিয়ে যায়। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, মিসর সীমান্তবর্তী লিবিয়ার তবরুক শহরের উপকূলের বিভিন্ন স্থান থেকে মৃতদেহগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় সাগরের নোনা জলে পড়ে থাকায় লাশগুলোতে মারাত্মক পচন ধরেছে। ফলে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, সাগরের বুকে এখনও অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। ঢেউয়ের তোড়ে আরও বেশ কিছু মরদেহ উপকূলে ভেসে আসার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে, আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তবরুক রেড ক্রিসেন্ট তাদের উদ্ধার অভিযানের বেশ কিছু হৃদয়বিদারক ছবি প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যায়, স্বেচ্ছাসেবীরা সাদা রঙের বিশেষ সুরক্ষামূলক পোশাক পরে পাথুরে উপকূল থেকে পচনশীল মরদেহগুলো উদ্ধার করে পরম যত্নে সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে রাখছেন।
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার এই মরণযাত্রা নতুন কিছু নয়। ২০১১ সালে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সমর্থিত এক সশস্ত্র বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে লিবিয়ার দীর্ঘকালীন শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকারের পতন ঘটে। এরপর থেকেই দেশটিতে চরম প্রশাসনিক শূন্যতা ও অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারীরা লিবিয়াকে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট রুট বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে।
মূলত আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং চরম দারিদ্র্যপীড়িত মানুষজন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথ বেছে নেন। দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রতি বছর হাজার হাজার অভিবাসী সাহারা মরুভূমি এবং ভূমধ্যসাগরের চরম বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিতে গিয়ে সলিলসমাধির শিকার হচ্ছেন।
অন্যদিকে, এই দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই লিবিয়ার খুমস শহরের উপকূলে আরও একটি যাত্রীবাহী নৌকাডুবির খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী ত্রিপোলিভিত্তিক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জরুরি চিকিৎসা ও সহায়তা কেন্দ্র জানিয়েছে, উত্তাল সাগরে নৌকাটি উল্টে যাওয়ার পর সেখান থেকে ১৩ জন অভিবাসীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে ওই নৌকায় ঠিক কতজন যাত্রী ছিলেন বা তাদের গন্তব্য কোথায় ছিল, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।