সংযুক্ত আরব আমিরাতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলার ঘটনা এবং ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। সোমবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি দুই দশমিক তিন ডলার বেড়ে ১১১ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুড তেলের দামও দুই শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ১০৭ ডলারের উপরে অবস্থান করছে। জুন মাসের সরবরাহের জন্য চুক্তিবদ্ধ তেলগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে এই দাম বৃদ্ধি বাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
এর আগে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসবে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ হবে—এমন আশায় বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফেরার ইঙ্গিত মিলেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলা এবং সৌদি আরবে ড্রোন হামলার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সেই আশার গুড়ে বালি পড়েছে। আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা একে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর কড়া জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে, সৌদি আরবও তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপকে ঘিরে। মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে ট্রাম্পের আসন্ন বৈঠকের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আসার পর থেকেই বাজারে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি কোনো সংঘাত শুরু হলে পারস্য উপসাগরের তেল অবকাঠামোগুলো সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে পড়বে।
প্রেস্টিজ ইকোনমিক্সের বাজার বিশ্লেষক জেসন শেনকার সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে এই টানাপোড়েন যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের দামের নেতিবাচক প্রভাব ততই প্রকট হবে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে সুদের হার উচ্চমাত্রায় থাকতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। বাজার বিশ্লেষক টনি সিকামোর মনে করেন, চলমান ড্রোন হামলাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট সতর্কবার্তা। ইরান বা তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো যে কোনো হামলার বিপরীতে আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে—এই আতঙ্কই এখন তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকেও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিরসনের কোনো দৃশ্যমান সমাধান না আসায় বিশ্ববাজার অনেকটা অনিশ্চয়তার দোলাচলে দুলছে। এখন মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে তেলের বাজারে স্বস্তি ফিরবে নাকি অস্থিরতা আরও বাড়বে।
তেলের দামের এই অস্থিতিশীলতা প্রমাণ করে যে, বিশ্ব অর্থনীতি কতটা ভঙ্গুরভাবে জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি রক্ষা না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববাজারের ওপর এই খড়্গ ঝুলে থাকবে। যুদ্ধের দামামা কেবল অত্র অঞ্চলের শান্তিকেই বিঘ্নিত করে না, বরং এর অর্থনৈতিক অভিঘাত সাধারণ মানুষের নিত্যপণ্যের দামে প্রভাব ফেলে। স্থিতিশীলতার জন্য কূটনীতিই একমাত্র পথ, নতুবা সংঘাতের মাশুল দিতে হবে পুরো বিশ্বকে।