ইসরায়েল ও লেবাননকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যখন চরম সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করছে, ঠিক তখনই দীর্ঘদিনের বৈরিতা ভুলে ইরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, এই ঐতিহাসিক চুক্তির আলোচনা এখন একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই তা আলোর মুখ দেখতে পারে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এনবিএ) চূড়ান্ত খেলা উপভোগ শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, বিবদমান পক্ষগুলো এখন অত্যন্ত কার্যকর একটি চুক্তির একদম শেষ ধাপে এসে দাঁড়িয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে খুব শিগগিরই, অর্থাৎ দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের বরফ গলার এই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প জানান, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি অনুযায়ী, তেহরান (ইরানের রাজধানী ও সরকার) এরই মধ্যে এই নীতিগত সিদ্ধান্তে তাদের আনুষ্ঠানিক সম্মতি জ্ঞাপন করেছে। পারমাণবিক ইস্যুটি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার মূল কারণ ছিল। তাই ইরানের এই সম্মতিকে বৈশ্বিক কূটনীতিতে একটি বিশাল অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির (বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি তেল চলাচলের সামুদ্রিক জলপথ) বিষয়টিও এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, চূড়ান্ত চুক্তিতে সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টির কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত এই হরমুজ প্রণালি পুনরায় সবার জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তবে তিনি এ-ও স্পষ্ট করেছেন যে, চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন অবরোধ (অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা) পুরোপুরি বহাল থাকবে।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে সামরিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যেও আলোচনা যে থেমে নেই, সে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মার্কিন গণমাধ্যমটি। নিজের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশাল'-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প লিখেছেন, "কোনো অজ্ঞতা বা বোকামি যদি এই প্রক্রিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তবে শান্তি আলোচনা তার আপন গতিতেই চলতে থাকবে।"
তবে যুক্তরাষ্ট্র এমন আশাবাদের কথা শোনালেও, ইরান তাদের পুরনো অবস্থানে এখনও বেশ অনড় ও কঠোর। ইরান পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে, ওয়াশিংটনের (মার্কিন প্রশাসন) সঙ্গে যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী এবং বৃহত্তর সমঝোতার বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে লেবাননে চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধের ওপর। বর্তমানে লেবাননের মাটিতে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র সংঘাত চলছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেছে, লেবাননে যদি ইসরায়েলের এই আগ্রাসন অব্যাহত থাকে, তবে তারা বাধ্য হয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আবারও সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
গত সোমবার ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, লেবাননের রাজধানী বৈরুত এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের ধারাবাহিক ও নির্বিচার হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সর্বাত্মক ও ভয়াবহ সংঘাতের সূচনা করতে পারে বলে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সংঘাত থামানোর বা যুদ্ধবিরতির কোনো লক্ষণ এখনই দেখাচ্ছেন না। তিনি উল্টো বেশ আক্রমণাত্মক ভাষায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের যে যুদ্ধ, তা এখনও শেষ হয়নি। নেতানিয়াহু হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ইসরায়েলের ভূখণ্ডে নতুন করে কোনো হামলা চালানো হলে তার অত্যন্ত কঠোর এবং দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি বরাবরই অত্যন্ত জটিল এবং হিসাব-নিকাশের সমীকরণে আবদ্ধ। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির এমন আকস্মিক ঘোষণা বিশ্বশান্তির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েল ও লেবানন সীমান্তে সমানে বাজছে যুদ্ধের দামামা। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরে আসার সম্মতি যদি সত্য হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় জয়। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক অবস্থান এবং লেবাননে হামলা বন্ধ না করার জেদ এই চুক্তির ভবিষ্যৎকে কতটুকু টেকসই করবে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই যায়। শান্তি কি আসলেই আসন্ন, নাকি এটি কেবলই পরাশক্তিগুলোর নতুন কোনো রাজনৈতিক চাল—বিশ্ববাসীকে এখন এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তরের জন্যই সাগ্রহে অপেক্ষা করতে হবে।