ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চরম উত্তেজনার মাঝে দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি যেন এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি হয়ে এসেছে। এই বিরতির মধ্যেই হরমুজ প্রণালি (পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ) দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে সংকটের স্থায়ী সমাধানে ওয়াশিংটনের কাছে ১০ দফার একটি দীর্ঘ প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান, যাকে আলোচনার জন্য ‘কার্যকর ভিত্তি’ বলে অভিহিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইসলামাবাদে কূটনীতির মাঠ গরম পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সেখানে ঐতিহাসিক এই শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে পৌঁছেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার। মূল আলোচনায় বসার আগে মার্কিন প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকে পাকিস্তানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি।
অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী প্রতিনিধিদলও ইসলামাবাদে অবস্থান করছেন। তাঁরাও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। শাহবাজ শরিফ আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় মাইলফলক হবে।
তেহরানের ১০ দফা বনাম ওয়াশিংটনের ১৫ দফা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রস্তাবের বিস্তারিত প্রকাশ না করলেও বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র তেহরানের প্রধান দাবিগুলো সামনে এনেছে। ইরানের ১০ দফার মূল বিষয়গুলো হলো: ১. পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সব ধরনের সামরিক তৎপরতা বা যুদ্ধবিগ্রহ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। ২. ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়ার বিষয়ে ওয়াশিংটনকে লিখিত ও দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। ৩. যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যাংকে এবং আন্তর্জাতিকভাবে জব্দ থাকা ইরানের বিশাল অঙ্কের অর্থ ও সম্পদ অবিলম্বে ফেরত দিতে হবে। ৪. সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে ইরানের অবকাঠামোর যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ওয়াশিংটনকে ‘পূর্ণ ক্ষতিপূরণ’ প্রদান করতে হবে।
ইরানের এই ১০ দফার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রও ১৫ দফার একটি পাল্টা পরিকল্পনা তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাবকে ইতিবাচক বললেও ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন শর্তাবলির মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র (ব্যালিস্টিক মিসাইল) নিয়ন্ত্রণের মতো অত্যন্ত কঠোর বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে? ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া এই দরকষাকষি কেবল ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজার এবং নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তবে ক্ষতিপূরণ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলোতে দুই পক্ষ কতটা ছাড় দেবে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই শান্তি আলোচনার সফলতা।
বিশ্লেষণ: আস্থার সংকট কাটিয়ে শান্তি কি সম্ভব? ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ কয়েক দশকের শত্রুতা কাটিয়ে এক টেবিলে বসাটাই একটি বড় অর্জন। তবে ইরানের ‘পূর্ণ ক্ষতিপূরণ’ দাবি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিসাইল নিয়ন্ত্রণ’ শর্ত—এ দুই মেরুর অবস্থান মেলানো কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। এটি কি কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি দীর্ঘ করার কৌশল, নাকি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে যাচ্ছে? যদি উভয় পক্ষই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা না দেখায়, তবে এই ১০ বা ১৫ দফা কেবল কাগজের দলিলেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।