মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা প্রশমন ও আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে ইরানে পুনরায় নিজেদের কূটনৈতিক কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে স্পেন। বৃহস্পতিবার দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে দেওয়া এক ভাষণে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস তেহরানে দূতাবাস পুনরায় চালুর এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি জানান।
বিশ্ব রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্পেনের এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলবারেস সংবাদমাধ্যমকে জানান, তিনি ইতিমধ্যে তেহরানে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে কর্মস্থলে ফেরার এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে দূতাবাসের কার্যক্রম শুরু করার আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দিয়েছেন। তার মতে, ইরানের রাজধানী থেকেই শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সরাসরি অংশ নেওয়া এবং আলোচনার পথ প্রশস্ত করা এখন সময়ের দাবি।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে আসছে মাদ্রিদ (স্পেনের রাজধানী)। ওয়াশিংটনের অন্যান্য ইউরোপীয় মিত্ররা যখন নীরবতা পালন করছে, তখন স্পেন ইরানে হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের এমন যুদ্ধংদেহী মনোভাবের বিরুদ্ধে স্পেনের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলাকে ‘বেপরোয়া ও অবৈধ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, বৈশ্বিক শান্তি বিঘ্নিত করে এমন কোনো অন্যায্য কর্মকাণ্ডে স্পেন কখনোই অংশীদার হবে না। স্পেনের এই দৃঢ় অবস্থানের কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে মাদ্রিদের কূটনৈতিক দূরত্ব বাড়লেও তারা নিজেদের শান্তিবাদী নীতিতে অটল রয়েছে।
তবে তেহরানে স্পেনের এই দূতাবাস খোলার সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইসরাইল। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা’আর অভিযোগ করেছেন যে, এই পদক্ষেপ ইরান শাসনের সঙ্গে সমঝোতা করার শামিল। অন্যদিকে, স্পেনও ছেড়ে কথা বলেনি। বুধবার লেবাননে ইসরাইলি বিমান হামলার কঠোর সমালোচনা করেছেন স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে লেবাননে বোমা বর্ষণ করা আন্তর্জাতিক আইনের চরম অবমাননা।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বুধবার বৈরুত ও এর আশপাশের এলাকায় ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে গেছে এবং সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এই অমানবিক হামলার প্রেক্ষাপটে স্পেন মনে করছে, সংঘাত নিরসনে সরাসরি আলোচনার কোনো বিকল্প নেই এবং সেই লক্ষ্যেই তারা তেহরানে কূটনৈতিক সংযোগ পুনরায় স্থাপন করছে।
স্পেনের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নতুন ধারার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে স্পেন সম্ভবত প্রথম দেশ যারা সরাসরি সামরিক শক্তি প্রদর্শনের বদলে কূটনৈতিক আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে মাদ্রিদ যখন তার মিত্রদের অন্যায্য যুদ্ধের বিরোধিতা করে, তখন তা বিশ্বশান্তির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এই উদ্যোগ কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারবে, নাকি তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা হয়ে থাকবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।